ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভ্রমণ ও মানুষের যাতায়াত দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই স্বাভাবিক প্রবাহে বড় পরিবর্তন এলো। বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা দেওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে পর্যটক ভিসা পাওয়া এখন আর আগের মতো সহজ থাকছে না।
বিশেষ করে কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের উপদূতাবাসগুলোতে ভারতীয় নাগরিকদের পর্যটক ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কোন কোন কেন্দ্র থেকে পর্যটক ভিসা সীমিত হলো
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশন থেকে পর্যটক ভিসা কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে নিয়মিতভাবে ভিসা দেওয়া হতো, এখন সেখানে কার্যত পর্যটক ভিসা প্রায় বন্ধের পথে।
কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে থাকা বাংলাদেশের উপদূতাবাসগুলো থেকে পর্যটক ভিসা দেওয়া সীমিত করা হয়েছে। এর আগেই নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ত্রিপুরার আগরতলায় থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনারের দফতর থেকে ভিসা দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে এখন ভারতের মধ্যে শুধুমাত্র গুয়াহাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাই কমিশনারের দফতর থেকেই সীমিত পরিসরে ভিসা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত, পেছনের প্রেক্ষাপট
এই ভিসা সীমাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রেক্ষাপট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সেই সময় বাংলাদেশে অবস্থিত চারটি ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনেও বিক্ষোভ দেখা যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে তখন ভারত সরকার সাময়িকভাবে সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। কয়েকদিন পর ভিসা সেন্টারগুলো আবার চালু হলেও ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মেডিকেল ভিসা ও কিছু জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য ভিসা আপাতত ইস্যু করা হবে না।
এই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের ভিসা কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
পর্যটক ভিসা সীমিত হলেও কোন ভিসা চালু আছে
পর্যটক ভিসা সীমিত করা হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাণিজ্যিক ভিসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভিসা কার্যক্রম এখনো চালু রয়েছে। ব্যবসা, শিক্ষা, সরকারি কাজ বা বিশেষ প্রয়োজনে যারা বাংলাদেশে যেতে চান, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জরুরি যোগাযোগ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই অন্যান্য ভিসা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।
ভারতীয় পর্যটকদের জন্য কী প্রভাব পড়বে
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর। চিকিৎসা, ধর্মীয় স্থান ভ্রমণ, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা বা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের জন্য যারা বাংলাদেশে যেতে চাইতেন, তাদের জন্য এখন পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক মানুষ নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। পর্যটক ভিসা সীমিত হওয়ায় তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রাখতে হচ্ছে।
অনেক ট্রাভেল এজেন্সি বলছে, ভিসা অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশগামী ট্যুর বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব
ভিসা কার্যক্রম সীমিত হওয়া শুধু পর্যটন নয়, দুই দেশের মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ওপরও প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে এই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই অবস্থা আরও কিছুদিন চলতে পারে।
বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র
বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় পর্যটক ভিসা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ভারত সরকার আগেই জানিয়েছে, মেডিকেল ভিসা এবং অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা আপাতত দেওয়া হবে না।
ফলে দুই দিক থেকেই পর্যটন ভিসা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের পর্যটন খাত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে।
কবে স্বাভাবিক হতে পারে পরিস্থিতি
যদিও এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা হলে ধাপে ধাপে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই প্রথমে পর্যটক ভিসা সীমাবদ্ধতা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

