Homeইতিহাস-ঐতিহ্যবিলুপ্তির পথে পোস্টকার্ড: সস্তা বার্তা পাঠানোর ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?

বিলুপ্তির পথে পোস্টকার্ড: সস্তা বার্তা পাঠানোর ঐতিহ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?

Share

একটা সময় ছিল, যখন কারও খবর নিতে বা শুভেচ্ছা জানাতে মানুষ অপেক্ষা করতো একটা ছোট্ট কাগজের জন্য—পোস্টকার্ড। খুব সাধারণ, খুব সস্তা, কিন্তু ভীষণ আবেগে ভরা। এখন সেই পোস্টকার্ড ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। প্রযুক্তির ঝড়ের মধ্যে পড়ে এই সহজ মাধ্যমটা যেন আর টিকেই থাকতে পারছে না।

পোস্টকার্ড: কম খরচে যোগাযোগের এক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম

বাংলাদেশের ডাক বিভাগের পোস্টকার্ড একসময় ছিল মানুষের সবচেয়ে সহজ আর সাশ্রয়ী যোগাযোগের উপায়। মাত্র ৫০ পয়সায় দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বার্তা পাঠানো যেত। ভাবতে পারো? এত কম খরচে কেউ নিজের মনের কথা লিখে পাঠিয়ে দিতো!

ঈদ, পূজা বা জন্মদিন—সব ধরনের উপলক্ষে পোস্টকার্ড ছিল খুব জনপ্রিয়। শুধু বার্তা পাঠানো নয়, অনেকেই এটাকে স্মৃতি হিসেবে জমিয়ে রাখতেন। একটা ছোট্ট কার্ড, কিন্তু তার ভেতরে থাকতো অনেক বড় অনুভূতি।

ডিজিটাল যুগে হারিয়ে যাচ্ছে পোস্টকার্ডের ব্যবহার

এখন সময় বদলেছে। মানুষ আর অপেক্ষা করতে চায় না। মুহূর্তের মধ্যে মেসেজ পৌঁছে যায় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মে। ফলে পোস্টকার্ডের জায়গা দখল করে নিয়েছে এই ডিজিটাল মাধ্যমগুলো।

এখন পোস্টকার্ডের দাম দুই টাকা হলেও, ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। মানুষ এখন সহজ পথ বেছে নেয়—মোবাইল খুলে কয়েকটা ট্যাপ, আর বার্তা পৌঁছে যায়। সেখানে পোস্টকার্ড কিনে, লিখে, পোস্ট অফিসে গিয়ে পাঠানো—এটা অনেকের কাছে ঝামেলার মনে হয়।

ঈদের শুভেচ্ছায় পোস্টকার্ড: হারিয়ে যাওয়া আনন্দ

এই পরিবর্তনের মাঝেও কিছু মানুষ এখনো পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। যেমন এনামুল হক—তিনি এবারের ঈদে পোস্টকার্ডে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন তার বন্ধুকে।

তার কথায়, এখন পোস্টকার্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন। আগে স্টেশনারি দোকানে সহজেই পাওয়া যেত, কিন্তু এখন খুঁজতে গেলে অনেক কষ্ট করতে হয়। তারপরও তিনি কয়েকজন বন্ধুকে পোস্টকার্ডে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন, শুধু ছোটবেলার সেই আনন্দটা আবার অনুভব করার জন্য।

ভাবো তো, হাতে লেখা একটা শুভেচ্ছা বার্তা—এটার অনুভূতি কি একটা মেসেঞ্জার টেক্সটের মতো হতে পারে?

পোস্টকার্ড বিক্রি বন্ধের অভিযোগ: বাস্তবতা কী?

কিছু সময় ধরে এমন অভিযোগও শোনা গেছে যে পোস্টকার্ড বিক্রি নাকি বন্ধ ছিল। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় দেড় বছর এই বিক্রি কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা যায় বলে অনেকে দাবি করেছেন।

এর পেছনে নানা কারণের কথা বলা হলেও, কেউই প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি। তবে অনেকেই বলেছেন, পোস্টকার্ড কিনতে গিয়ে তারা বাধার মুখে পড়েছেন।

অন্যদিকে, ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্রি কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আসলে মানুষই কিনতে আসে না। একসময় বড় পরিমাণে পোস্টকার্ড ছাপানো হলেও, তার অনেকটাই এখন অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।

ঢাকার বাইরে পোস্টকার্ডের চিত্র

শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য জেলাতেও একই অবস্থা। আগে আত্মীয়-স্বজনকে খবর পাঠাতে বা শুভেচ্ছা জানাতে পোস্টকার্ডের বেশ কদর ছিল। এখন সেই চাহিদা প্রায় শূন্য।

তবে কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, যদি পোস্টকার্ডকে নতুনভাবে ডিজাইন করা যায়, আরও আকর্ষণীয় করা যায়, তাহলে নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আবার জনপ্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে শিশু বা টিনএজারদের জন্য এটি একটা মজার অভিজ্ঞতা হতে পারে।

লেটার বক্সের ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণ

একটা সময় ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় লেটার বক্স দেখা যেত। হলুদ, লাল, নীল—ভিন্ন ভিন্ন রঙের বক্সের আলাদা আলাদা ব্যবহার ছিল।

কিন্তু এখন সেই দৃশ্য প্রায় নেই। অধিকাংশ লেটার বক্স সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কারণ ব্যবহার কমে গেছে। মানুষ যখন চিঠিই পাঠায় না, তখন লেটার বক্সের দরকারটাই বা কোথায়?

তবে এখনও কিছু লেটার বক্স সক্রিয় আছে, বিশেষ করে পোস্ট অফিসের আশেপাশে। প্রয়োজনে আবার নতুন করে বসানোর পরিকল্পনাও আছে।

ডাক বিভাগের বর্তমান অবস্থা ও ডিজিটাল রূপান্তর

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৯,৮৪৮টি ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে জিপিও, এ গ্রেড, বি গ্রেড, উপজেলা, সাব পোস্ট অফিস এবং শাখা ডাকঘর—সব মিলিয়ে বিশাল একটি নেটওয়ার্ক।

এখন ডাক বিভাগ শুধু চিঠি বা পোস্টকার্ড নয়, ডিজিটাল সেবাও দিচ্ছে। দেশের দুর্গম এলাকাতেও তারা বিভিন্ন আধুনিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

তবুও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আধুনিকতার ভিড়ে কি আমরা আমাদের পুরোনো আবেগগুলো হারিয়ে ফেলছি?

পোস্টকার্ড কি আবার ফিরে আসতে পারে?

পোস্টকার্ড পুরোপুরি হারিয়ে যাবে—এটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কারণ, কিছু জিনিস থাকে যেগুলো সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু পুরোপুরি মুছে যায় না।

যদি নতুনভাবে ভাবা যায়—আকর্ষণীয় ডিজাইন, স্মার্ট মার্কেটিং, স্কুল-কলেজে প্রচার—তাহলে পোস্টকার্ড আবার ফিরে আসতে পারে। হয়তো আগের মতো নয়, কিন্তু নতুন একটা রূপে।

শেষ কথা হলো, পোস্টকার্ড শুধু একটা যোগাযোগ মাধ্যম নয়। এটা একটা অনুভূতি। একটা অপেক্ষা। একটা স্পর্শ।

আর এই জিনিসগুলো কখনো পুরোপুরি ডিজিটাল হতে পারে না।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন