Homeট্রেন্ডিং নিউজএআই ক্যামেরায় মামলা! ফোনে বিআরটিএ’র ভুয়া বার্তা পেলে কী করবেন?

এআই ক্যামেরায় মামলা! ফোনে বিআরটিএ’র ভুয়া বার্তা পেলে কী করবেন?

অনেকে বিষয়টিকে সত্যি ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ আবার লিংকে ক্লিক করে ব্যক্তিগত ব্যাংক তথ্য দিয়ে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত একটি “ফিশিং স্ক্যাম

Share

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি নতুন ধরনের এক সাইবার প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’র নাম ব্যবহার করে অনেকের মোবাইলে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া জরিমানার বার্তা। সেখানে বলা হচ্ছে, এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনেকে বিষয়টিকে সত্যি ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ আবার লিংকে ক্লিক করে ব্যক্তিগত ব্যাংক তথ্য দিয়ে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত একটি “ফিশিং স্ক্যাম”, যার মাধ্যমে সাইবার অপরাধীরা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে।

কী ধরনের বার্তা পাঠানো হচ্ছে?

ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহফুজ পলাশের মোবাইলে সম্প্রতি একটি এসএমএস আসে। সেখানে দাবি করা হয়, তার গাড়ি নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করেছে এবং বিআরটিএ তার বিরুদ্ধে জরিমানা করেছে।

বার্তায় আরও বলা হয়, দ্রুত টাকা পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথচ মাহফুজ পলাশের দাবি, তিনি নিয়ম মেনেই গাড়ি চালান এবং এমন ম্যাসেজ পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

শুধু তিনি নন, একই ধরনের বার্তা পেয়েছেন আরও অনেকে। এমনকি যাদের কোনো গাড়ি বা মোটরসাইকেলই নেই, তারাও এই এসএমএস পাচ্ছেন।

এআই ট্রাফিক সিস্টেমকে ব্যবহার করে নতুন প্রতারণা

সম্প্রতি ঢাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে এআইভিত্তিক ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় মামলা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত করা হচ্ছে।

সাইবার প্রতারকরা এখন এই নতুন প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করছে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করার জন্য। তারা এমনভাবে ম্যাসেজ তৈরি করছে, যাতে সেটি সরকারি বার্তা বলেই মনে হয়।

এসএমএসে লেখা থাকে—

“বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক জরিমানার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিজ্ঞপ্তি।”

এরপর মামলার নম্বর, তারিখ, জরিমানার পরিমাণ এবং আইনগত ব্যবস্থার ভয় দেখানো হয়।

কীভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে?

এসএমএসে একটি ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হচ্ছে, যা দেখতে সরকারি ওয়েবসাইটের মতো। সেখানে প্রবেশ করলে গাড়ির নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বলা হয়।

এরপর বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা দিলে ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। তখন অনেকেই দ্রুত টাকা দেওয়ার জন্য ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে বসেন।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কার্ডের নম্বর, মেয়াদ এবং সিভিভি কোড সংগ্রহ করা।

একবার এই তথ্য প্রতারকদের হাতে গেলে তারা খুব সহজেই অনলাইন লেনদেন করতে পারে।

ভুয়া লিংক চেনার উপায়

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ওয়েবসাইট চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ডোমেইন নাম দেখা।

বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইটের শেষে সাধারণত “.gov.bd” থাকে। কিন্তু প্রতারণামূলক এসব লিংকে সেটি থাকে না।

এছাড়া বেশিরভাগ ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে +৬৩ কোডযুক্ত নম্বর থেকে। এই কোডটি ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক নম্বর।

এগুলো দেখেই বুঝতে হবে যে বার্তাটি সন্দেহজনক।

ম্যাসেজ পেলে কী করবেন?

এ ধরনের এসএমএস পেলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমেই কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

প্রথমত, অপরিচিত লিংকে কখনো ক্লিক করবেন না।

দ্বিতীয়ত, কোনো ওয়েবসাইটে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেবেন না।

তৃতীয়ত, বার্তাটি সত্যি কিনা তা যাচাই করতে সরাসরি বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশের অফিসিয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ করুন।

অনেকে কৌতূহলবশত লিংকে ঢুকে পড়েন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিই সবচেয়ে বড় ভুল।

ডিএমপি ও বিআরটিএ কী বলছে?

সাম্প্রতিক এই প্রতারণা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

বিআরটিএ জানিয়েছে, এসব ভুয়া ওয়েবসাইট ও বার্তার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণকে কোনো লিংকে ক্লিক না করার এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে ডিএমপি জানিয়েছে, ট্রাফিক মামলার ক্ষেত্রে সাধারণত স্বাক্ষরযুক্ত অফিসিয়াল চিঠি পাঠানো হয়। বিশেষ প্রয়োজনে কেবল নির্দিষ্ট সরকারি নম্বর থেকেই এসএমএস পাঠানো হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক বি এম মঈনুল হোসেন বলেন, প্রতারকরা এমনভাবে বার্তা তৈরি করে যাতে মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে।

তার মতে, প্রথমে মানুষের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি করা হয়। এরপর দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, এটি মূলত “ফিশিং অ্যাটাক”। এখানে ব্যবহারকারীর ব্যাংক কার্ডের গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য।

প্রতারণার শিকার হলে কী করবেন?

যদি ভুল করে কোনো লিংকে প্রবেশ করে কার্ডের তথ্য দিয়ে ফেলেন, তাহলে দ্রুত ব্যাংকের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে কার্ড ব্লক করতে হবে।

একই সঙ্গে নিকটস্থ থানায় বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানানো উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বর্তমানে প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবন সহজ করছে, তেমনি নতুন নতুন প্রতারণার পথও তৈরি হচ্ছে। তাই যেকোনো এসএমএস, ফোনকল বা লিংক সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, সরকারি সংস্থা কখনোই সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করে ব্যক্তিগত ব্যাংক তথ্য দিতে বলবে না।

একটু সতর্ক থাকলেই এ ধরনের সাইবার প্রতারণা থেকে নিজেকে ও নিজের অর্থ নিরাপদ রাখা সম্ভব।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন