কলকাতার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিউ মার্কেট শুধু একটা বাজার নয়—এটা আসলে ইতিহাস, সংঘর্ষ আর ক্ষমতার এক জীবন্ত দলিল। আজ আমরা যাকে সহজভাবে “হগ মার্কেট” বলে চিনি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে ১৮৭৩-৭৪ সালের এক নাটকীয় গল্প। এই গল্পে আছে ব্রিটিশ শাসনের অহংকার, দেশীয় ধনীদের প্রতিরোধ, আর সাধারণ মানুষের বাঁচার লড়াই।
হগ মার্কেট কীভাবে শুরু হল
১৮৭৩ সালের কলকাতা। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব তখন শহরের প্রতিটি কোণায়। শহরের উন্নয়নের নামে অনেক কিছুই বদলানো হচ্ছিল, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে ছিল এক ধরনের বৈষম্য। ব্রিটিশ সাহেবরা নিজেদের জন্য আলাদা সুবিধা চাইত, আর সেটাই ছিল নিউ মার্কেট তৈরির মূল কারণ।
স্যার চার্লস স্টুয়ার্ট হগ ছিলেন তখন কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। তাঁর হাতে ছিল বিশাল ক্ষমতা। তিনি ভাবলেন, “নেটিভ”দের বাজারে সাহেবরা কেনাকাটা করবে—এটা তো অসম্ভব! তাই দরকার একটা একেবারে আলাদা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাজার, শুধুমাত্র ইউরোপিয়ানদের জন্য।
এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় নিউ মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা।
হীরালাল শীল ও তাঁর বাজার
এখন আসি গল্পের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—বাবু হীরালাল শীল। তিনি ছিলেন কলকাতার একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং ধনী ব্যক্তি। তাঁর ধর্মতলার বাজার ছিল শহরের অন্যতম বড় বাজার, যেখানে অসংখ্য সবজিওয়ালা, ছোট ব্যবসায়ী আর শ্রমজীবী মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত।
এই বাজার শুধু ব্যবসার জায়গা ছিল না—এটা ছিল মানুষের জীবনের কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের আসা-যাওয়া, হাসি-কান্না, লড়াই আর স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল।
কিন্তু হগ সাহেবের নজর পড়ল ঠিক এই বাজারেই।
সংঘর্ষের সূচনা: বাজার দখলের চেষ্টা
হগ সিদ্ধান্ত নিলেন, এই বাজারটাই ভেঙে সেখানে নতুন বাজার তৈরি করা হবে। যেন একটা জায়গা, যেখানে শুধুমাত্র সাহেবরা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পারবে।
পুলিশ পাঠানো হল বাজার খালি করার জন্য।
কিন্তু বিষয়টা এত সহজ ছিল না।
হীরালাল শীল সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন। তিনি তাঁর লাঠিয়াল বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন—পুলিশ এলে প্রতিরোধ করতে হবে। এরপর যা হল, সেটা এক কথায় “বাজার যুদ্ধ”।
কলকাতার প্রথম গণপ্রতিরোধ
প্রতিদিন পুলিশ আর লাঠিয়ালদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে লাগল। সাধারণ ব্যবসায়ীরাও এতে জড়িয়ে পড়ে। এটা শুধু দুই পক্ষের লড়াই ছিল না—এটা ছিল সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এই ঘটনাকে অনেকেই কলকাতার প্রথম গণপ্রতিরোধ বলে মনে করেন।
ভাবুন তো, আজকের দিনে যেমন কোনো বাজার হঠাৎ বন্ধ করে দিলে সবাই প্রতিবাদে নেমে পড়ে—তখনও ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটেছিল, শুধু পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি কঠিন।
নাটকেও উঠে এল এই লড়াই
এই সংঘর্ষ এতটাই আলোড়ন তুলেছিল যে তা থিয়েটারের মঞ্চেও উঠে আসে।
শিশির কুমার ঘোষ লিখলেন একটি নাটক—“দি ব্যাটল অব দি মার্কেটস”। এই নাটকটি ধর্মতলায় নিয়মিত মঞ্চস্থ হত এবং দর্শকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আরেকটি নাটকও লেখা হয়েছিল—“গ্রেট মার্কেট ওয়ার”, যার নাট্যকার ছিলেন সুরেন্দ্র চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই নাটকগুলো শুধু বিনোদন ছিল না—এগুলো ছিল সমাজের বাস্তব চিত্র।
আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক চাপ
হীরালাল শীল বিষয়টি আদালতে নিয়ে যান। তিনি হগ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
১৮৭৩ সালের সংবাদপত্রগুলোতে এই মামলা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। “ভারত সংস্কারক” এবং “সুলভ সমাচার” পত্রিকায় এই ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এই ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়—এটা শুধু বাজারের লড়াই নয়, এটা ছিল ক্ষমতা বনাম অধিকার-এর লড়াই।
শেষ পর্যন্ত কী হল?
সব লড়াইয়ের পরেও শেষ পর্যন্ত জয় হল হগ সাহেবের।
মিউনিসিপ্যালিটি সাত লক্ষ টাকার বিনিময়ে হীরালাল শীলের বাজার কিনে নেয়। অনেকটা বাধ্য হয়েই হীরালাল শীল বাজার বিক্রি করতে রাজি হন।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় টাউন হলের এক বৈঠকে, যেখানে অনেক নামী দেশীয় ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের অনেকেই এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন।
১ জানুয়ারি ১৮৭৪: নিউ মার্কেটের উদ্বোধন
সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে ১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি উদ্বোধন হয় নিউ মার্কেট।
এই বাজার ছিল সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের সুবিধার জন্য তৈরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আধুনিক এবং আলাদা এক পরিবেশ—যেখানে দেশীয় মানুষের প্রবেশ খুব একটা স্বাগত ছিল না।
হগ মার্কেট নামের পেছনের গল্প
নিউ মার্কেট পরে “হগ মার্কেট” নামেও পরিচিত হয়, স্যার চার্লস হগের নাম অনুসারে।
আজও অনেকেই এই নামেই চেনে এই ঐতিহাসিক বাজারকে।
ইতিহাস থেকে কী শিখি?
এই পুরো ঘটনাটা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা যত বড়ই হোক, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ কখনোই ছোট নয়।
হীরালাল শীল হয়তো শেষ পর্যন্ত বাজার হারিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রতিরোধ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
আর সেই কারণেই নিউ মার্কেট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়—এটা একটা গল্প, একটা স্মৃতি, একটা সংগ্রামের প্রতীক।
আজকের নিউ মার্কেট
আজকের দিনে নিউ মার্কেট কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় শপিং স্পট। এখানে পাওয়া যায় প্রায় সবকিছু—কাপড়, খাবার, গয়না, উপহার, সবই।
কিন্তু যখন আপনি সেখানে হাঁটবেন, মনে রাখবেন—এই জায়গার প্রতিটি ইটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সময়ের লড়াই, স্বপ্ন আর ইতিহাস।
লেখক: রিফাত-বিন-ত্বহা।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
