বাংলা নববর্ষ এলেই একটা আলাদা অনুভূতি কাজ করে—নতুন বছরের শুরু, নতুন আশা, আর চারপাশে এক অন্যরকম আনন্দ। এই আনন্দের সবচেয়ে রঙিন আর প্রাণবন্ত প্রকাশ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। আজ এটা শুধু একটা শোভাযাত্রা না, বরং বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর একতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার গল্পটা শুরু হয় যশোর শহর থেকে। ১৯৮৫ সালের পহেলা বৈশাখের ভোর। মাইকেল মধুসূদন কলেজ-এর পুরাতন হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় এক নতুন উদ্যোগ।
আসলে এই ধারণাটা হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে ছিল একটা চিন্তা—দেশজ সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরা। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরির পর কিছু শিল্পী ভাবলেন, কেন না এমন কিছু করা যায়, যা মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়াবে আর একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সামনে নিয়ে আসবে।
এই ভাবনার নেতৃত্ব দেন ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম, চিত্রকর হিরন্ময় চন্দ এবং চারুপীঠের শিল্পীরা। তারা শিশুদের নিয়ে শুরু করেন এই শোভাযাত্রা—একেবারে সাধারণভাবে, কিন্তু ভেতরে ছিল অসাধারণ শক্তি।
মঙ্গল শোভাযাত্রা মানেই শুধু হাঁটা না—এটা একটা চলমান শিল্পকর্ম। এখানে ঢাক-ঢোলের শব্দ, সানাইয়ের সুর, রঙিন মুখোশ, বিশালাকৃতির প্রতীক—সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত উৎসব তৈরি হয়।
ভাবো তো, গ্রামের হারিয়ে যেতে বসা মুখোশ শিল্প, পুতুল, লোকজ মোটিফ—এসব শহরের রাস্তায় ফিরে আসছে নতুন রূপে। মানুষ শুধু দেখে না, অনুভব করে। ছোট বাচ্চা থেকে বয়স্ক—সবাই এই উৎসবের অংশ হয়ে যায়।
এটা ঠিক যেন একটা বড় ক্যানভাস, যেখানে সবাই নিজের মতো করে রঙ লাগাচ্ছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বার্তা। এটা শুধু আনন্দের জন্য নয়—এটা একটা প্রতিবাদও।
সমাজে যে বৈষম্য, সংকীর্ণতা, বিভাজন—এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটা শান্ত, সুন্দর উপায় হলো এই শোভাযাত্রা। এখানে কোনো ধনী-গরিব নেই, গ্রাম-শহরের পার্থক্য নেই। সবাই একসাথে হাঁটে, গান গায়, উদযাপন করে।
একভাবে দেখলে, এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা সবাই বাঙালি, আমাদের শিকড় এক।
যশোরের সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ পুরো বাংলাদেশের একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন দেশের প্রায় সব বড় শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। এমনকি দেশের বাইরেও বাঙালিরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, UNESCO মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি শুধু একটা পুরস্কার না—এটা প্রমাণ করে যে আমাদের লোকজ সংস্কৃতির ভেতরেই বিশ্বমানের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
ভাবলে ভালো লাগে—যে জিনিসটা একদিন ছোট করে শুরু হয়েছিল, সেটাই আজ বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিয়েছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা কখনো স্থির থাকে না। প্রতি বছর এতে নতুন নতুন থিম, নতুন ভাবনা যুক্ত হয়। এতে করে এটি সবসময়ই প্রাসঙ্গিক থাকে।
২০২৬ সালে যশোরে শোভাযাত্রার মূল ভাবনা রাখা হয়েছে—“নিত্যনূতনের অমৃত ধারা”। এই কথাটার ভেতরেই একটা গভীর অর্থ আছে। এর মানে হলো, পরিবর্তন আসবে, নতুন কিছু যোগ হবে, কিন্তু সেই ধারাটা থাকবে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
একভাবে বললে, এটা পুরোনো আর নতুনের সুন্দর একটা মেলবন্ধন।
অনেকেই ভাবতে পারে, এটা তো শুধু একটা উৎসব। কিন্তু আসলে এর ভেতরে অনেক বড় একটা বিষয় আছে।
প্রথমত, এটা আমাদের পরিচয় তুলে ধরে। আমরা কারা, আমাদের সংস্কৃতি কী—সেটা এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, এটা নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে। এখনকার অনেক ছেলে-মেয়ে হয়তো গ্রামের সেই পুরোনো সংস্কৃতি দেখে না। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তারা সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে চিনতে পারে।
তৃতীয়ত, এটা আমাদের এক করে। আজকের দিনে যখন মানুষ ছোট ছোট বিষয়ে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন এই শোভাযাত্রা সবাইকে একসাথে নিয়ে আসে।
ধরো, ভোরবেলা তুমি রাস্তায় বের হলে—চারপাশে ঢাকের শব্দ, মানুষের হাসি, রঙিন মুখোশ, আর সবার চোখে এক ধরনের আনন্দ। সেই মুহূর্তটা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করা যায়।
মঙ্গল শোভাযাত্রা ঠিক এমনই—এটা একটা অনুভূতি, যা ভাষায় পুরোপুরি বোঝানো যায় না।
মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু একটা অনুষ্ঠান নয়, এটা বাঙালির আত্মার অংশ। যশোরের সেই ছোট্ট শুরু আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর প্রতিটি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের শিকড় কখনো ভুলে যাওয়া উচিত না।
এই শোভাযাত্রা আমাদের শেখায়—একসাথে হাঁটতে, একসাথে উদযাপন করতে, আর নিজের সংস্কৃতিকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে।
নতুন বছর আসুক, নতুন স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন সবসময় আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে—এইটাই মঙ্গল শোভাযাত্রার আসল বার্তা।
লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

