রাজ্যের আবহাওয়া এখন একেবারেই স্থির নয়—একটু রোদ, একটু মেঘ, আবার হঠাৎ বৃষ্টি। এই অস্থির আবহাওয়ার পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্ত ও অক্ষরেখার যৌথ প্রভাব। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত এমনকি শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই একাধিক সতর্কতা জারি করেছে।
চলুন সহজভাবে পুরো পরিস্থিতিটা বুঝে নেওয়া যাক।
এই আবহাওয়ার মূল কারণ হলো উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ এবং দক্ষিণ উত্তরপ্রদেশের উপরে তৈরি হওয়া একটি ঘূর্ণাবর্ত। এই ঘূর্ণাবর্ত থেকে একটি অক্ষরেখা বিস্তৃত হয়ে উত্তর গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে নাগাল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
এখন ব্যাপারটা এমন—এই দুই সিস্টেম একসাথে কাজ করে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প টেনে আনছে। এই জলীয় বাষ্পই আকাশে জমে মেঘ তৈরি করছে, আর সেখান থেকেই হচ্ছে বৃষ্টি, ঝড়, এমনকি শিলাবৃষ্টি।
ভাবুন, যেন একটা বড় পাম্প সমুদ্র থেকে জল টেনে এনে আকাশে ঢালছে—তার ফলেই এই পরিস্থিতি।
দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাঁকুড়া, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় পরিস্থিতি কিছুটা বেশি তীব্র হতে পারে।
এই জেলাগুলিতে ঝড়ের গতি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কোথাও কোথাও দমকা হাওয়া ৮০ কিলোমিটার গতিও ছুঁতে পারে। এর সঙ্গে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে, যা ফসল বা গাড়ির ক্ষতি করতে পারে।
কলকাতা-সহ অন্যান্য জেলায়ও ঝড়ের গতি ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার হতে পারে। বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি হবে, তাই বাইরে থাকলে সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।
এই পরিস্থিতির জন্য দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
রবিবার তুলনামূলক কিছুটা কম হলেও বৃষ্টি পুরোপুরি থামবে না। পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং দুই মেদিনীপুরে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।
ঝাড়গ্রাম, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ঝড়ের সম্ভাবনার জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সোমবারও একই ধারা চলবে। প্রায় সব জেলাতেই বিক্ষিপ্তভাবে হালকা বৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ, একেবারে পরিষ্কার আকাশের আশা এখনই করা যাচ্ছে না।
উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি আরও একটু জটিল। জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে—৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে।
দার্জিলিং, কালিম্পং ও কোচবিহারে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে দার্জিলিং, কোচবিহার ও জলপাইগুড়িতে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে।
এই এলাকাগুলিতে ঝড়ের গতি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার হতে পারে। তাই কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
রবিবার ও সোমবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারে ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। সেখানে হলুদ সতর্কতা জারি রয়েছে।
আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের সব জেলাতেই বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি চলতে পারে। মানে, পুরোপুরি শুকনো আবহাওয়া এখনই ফিরছে না।
শুধু স্থলভাগেই নয়, সমুদ্রেও এর প্রভাব পড়েছে। সমুদ্রের উপর ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কোথাও কোথাও এই গতি ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এর ফলে সমুদ্র উত্তাল থাকবে। তাই মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—কারণ এই ধরনের আবহাওয়ায় সমুদ্রে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
অনেকেই ভাবছেন, হঠাৎ শিলাবৃষ্টি কেন? আসলে যখন আকাশে শক্তিশালী মেঘ তৈরি হয় এবং তার ভিতরে ঠান্ডা ও গরম বাতাসের সংঘর্ষ হয়, তখন জলকণা বরফে পরিণত হয়। সেই বরফই নিচে পড়ে শিলা হয়ে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা ঘটে খুব দ্রুত, তাই অনেক সময় রোদ থাকা অবস্থাতেও হঠাৎ শিলাবৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।
এই ধরনের আবহাওয়ায় কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখা খুব দরকার। যেমন ধরুন, ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে না থাকা ভালো। বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ ডাল ভেঙে পড়তে পারে।
বজ্রপাতের সময় মোবাইল ব্যবহার বা খোলা মাঠে থাকা এড়ানো উচিত। আর যদি বাইরে বেরোতেই হয়, তাহলে আবহাওয়ার আপডেট দেখে বেরোনো ভালো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আবহাওয়া বেশ অস্থির। ঘূর্ণাবর্ত ও অক্ষরেখার প্রভাবে ঝড়, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি—সব মিলিয়ে এক ধরনের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তাই আগামী কয়েকদিন একটু সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। আবহাওয়ার আপডেট চোখে রাখুন, আর অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন। ছোট্ট একটু সচেতনতাই বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
