স্বাধীনতা দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা এবং তার পরবর্তী ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি অর্জন করেছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। এই দিনটি শুধু একটি জাতীয় দিবস নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক।
প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— কত ত্যাগ, কত রক্ত এবং কত অশ্রুর বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। একইসঙ্গে এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
১৯৭১ থেকে ২০২৪— স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ৫৫ বছর আগে আমরা পাকিস্তানি শাসন, শোষণ, জুলুম ও নির্যাতনের নাগপাশ ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।
এই স্বাধীনতা নিছক কোনও উপহার ছিল না, এটি এসেছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অসীম সাহসের মধ্য দিয়ে। লাখ লাখ শহীদের রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগ এবং কোটি মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় তাই লেখা আছে মানুষের আত্মদানের উজ্জ্বল কাহিনি।
কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পার হওয়ার পর কিছু প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই সামনে এসে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ আসলে কী? কেবলমাত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই কি স্বাধীনতার পূর্ণতা? আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি, যার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছিল?
স্বাধীনতার সূচনালগ্নে যখন সদ্য স্বাধীন দেশের প্রতিটি কোণে বিজয়ের পতাকা উড়ছিল, তখনই লাখ লাখ মানুষ শরণার্থীশিবির থেকে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে এসেছিল। চোখে ছিল স্বপ্ন— একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন দেশের স্বপ্ন। প্রশ্ন হলো, সেই স্বপ্নগুলোর পুনর্গঠনে আমরা কি যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পেরেছি?
স্বাধীন হওয়ার পর গত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে— এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তির বিস্তার কিংবা দারিদ্র্য হ্রাসের মতো বিভিন্ন সূচকে দেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু অগ্রগতির এই চিত্রের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে।
দেশের সব মানুষ কি দুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছে? সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কি সত্যিই নিশ্চিত হয়েছে? পাকিস্তানি শাসকেরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু বৈষম্য ও বঞ্চনা কি পুরোপুরি দূর হয়েছে? সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বস্তুগত উন্নয়ন যতটা হয়েছে, মূল্যবোধ ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রে ততটা অগ্রগতি হয়নি। একটি দেশের অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ। এই জায়গাগুলোতে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি।
আসলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, কিন্তু সামাজিক স্বাধীনতা এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমাদের সংবিধান বাকস্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাধীনতা প্রায়ই ক্ষমতাধরদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক সময় অন্যায় দেখেও মানুষ মুখ খুলতে পারে না। ক্ষমতাবানদের অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলা যেন এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো একটি রাষ্ট্রকে এমন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, যেখানে দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থানের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা এটাই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার করা এবং দেশকে আত্মনির্ভর করে তোলা— এসবই স্বাধীনতার বাস্তব রূপ।
স্বাধীনতা মানে শুধু নির্বাচনকে সিঁড়ি বানিয়ে ক্ষমতায় বসা নয়। স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীল হওয়া, কর্তব্যপরায়ণ হওয়া এবং ন্যায়নীতি মেনে চলা। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ।
সেই লক্ষ্য পূরণে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা তৈরি করে, তাকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসে। একটি জাতির মধ্যে যদি প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বালানো না যায়, তবে সেই জাতির স্বাধীনতাও অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতা কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়। এটি কোনও পতাকা, চেয়ার কিংবা স্থাপনা নয় যে তাকে স্পর্শ করা যাবে বা ঘরে এনে সাজিয়ে রাখা যাবে। স্বাধীনতা আসলে একটি মানসিকতা একটি জীবনদর্শন।
এটি মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। কারও কাছে স্বাধীনতা রাজনৈতিক বিষয়, কারও কাছে সামাজিক, আবার কারও কাছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।
৫৫ বছর আগে আমরা পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় মনে হয়, সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই নতুন ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের নামে সহিংসতা, নারী নির্যাতন কিংবা গণপিটুনির মতো ঘটনা সমাজকে অস্থির করে তুলছে। অনেক সময় মনে হয়, স্বাধীনতার মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে আমরা যেন ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক। এখনও ‘ধর্ম অবমাননা’র অভিযোগ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগে দীপু দাস নামের একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে তো খুঁটির সঙ্গে বেধে পুড়িয়েই মারা হলো। এ ধরনের উগ্রতা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ একাত্তরে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেই দেশটিকে স্বাধীন করেছিল।
আজ বাংলাদেশ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়েছে। ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়নের মাধ্যমে মানুষ নতুন জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে গুজব, উগ্রতা এবং আইন অমান্যের প্রবণতাও বাড়ছে। সমাজের এই দ্বৈত প্রবণতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
এর মধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনেও এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যা অনেকের কাছে ইতিহাসের উল্টো পথে হাঁটার মতো মনে হচ্ছে। ২০২৪-এর আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রবল পরাক্রম নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আদালত কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত কয়েকজন নেতার নামে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হওয়া একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে আলোচিত হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল, তাদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অসম্মান হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে।
একইসঙ্গে সংসদে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় কিছু সংসদ সদস্যের আচরণও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে বসে থাকা এবং হৈচৈ করা অনেকের কাছে জাতীয় মর্যাদার অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিসরে “জুলাই চেতনা” নামের একটি নতুন ধারণাও আলোচনায় এসেছে। এর সমর্থকদের মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে দিয়ে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই ধারণাকে অনেক সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আড়াল করার বিকল্প বয়ান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব নিয়ে বিতর্ক দিন দিন দানা বাঁধছে। তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি এখনও মুক্তিযুদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলোও শেষ পর্যন্ত সেই চেতনার কাছেই ফিরে আসে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে দলগুলো ভোটারদের মুখোমুখি হয়েছে।
বিএনপি তো বটেই, জামায়াতে ইসলামী পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার ধারা থেকে সরে এসেছে। যারা অনলাইন-অফলাইনে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে প্রচার চালিয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের ‘ব্যবসা’ বাংলাদেশে আর চলবে না, তারাই নির্বাচনের আগে অলি আহমেদকে পারলে স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়ে দিচ্ছে, নিজেদের শহীদ পরিবারের সন্তান পরিচয় দিচ্ছে।
নির্বাচন এলেই প্রায় সব দলই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্যের কথা বলে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। আমাদের পূর্বপুরুষরা একাত্তরে যে স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছিলেন, তা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সাম্যমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন।
স্বাধীনতা তাই কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম নয়; এটি একটি জীবনদর্শন। অন্যের মতকে সম্মান করা, ভিন্ন মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া এবং মানুষের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই প্রকৃত স্বাধীনতার পরিচয়।
বর্তমান প্রজন্ম পাকিস্তানি শাসনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেনি। তারা ইতিহাস থেকে সেই গল্প শুনেছে। কিন্তু তাই বলে স্বাধীনতা দিবস তাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। বরং এই দিনটি তখনই আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন আমরা নতুন প্রজন্মকে অসমাপ্ত সংগ্রামের দিশা দেখাতে পারব একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং সত্যিকারের স্বাধীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম।
লেখক: চিররঞ্জন সরকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

