Homeটকিং পয়েন্টঅপারেশন সার্চলাইট থেকে স্বাধীনতা: ১৯৭১-এর সেই অগ্নিগর্ভ মুহূর্ত

অপারেশন সার্চলাইট থেকে স্বাধীনতা: ১৯৭১-এর সেই অগ্নিগর্ভ মুহূর্ত

Share

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একাত্তরের ২৬ মার্চ এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন, যার উৎপত্তি নিহিত রয়েছে পূর্ববাংলার দীর্ঘ রাজনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক দমননীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতায়।

ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন-পরবর্তী পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পূর্ববাংলা দ্রুতই রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব, ভাষাগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে— ফলে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা এবং গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা বাঙালিদের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়কে দৃঢ় করে তোলে।

জনগণের কাছে ক্রমেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি কোনও আঞ্চলিক সংস্কার নয়, বরং সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব। এসব প্রেক্ষাপটেই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে গণতান্ত্রিক বৈধতায় রূপান্তরিত করে, যদিও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালে সংকট চরমে ওঠে এবং যা রাষ্ট্রীয় সংঘাতের সূচনা করে দেয়।

এই সংকটের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির রাজনৈতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রিক নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো রূপায়ণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তিনি অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রকে অকার্যকর করে দেন এবং পূর্ববাংলায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত জনগণের হাতে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ইতিহাস পাঠ থেকে এতটুকু আমি নিশ্চিত, ২৫ মার্চের আগেই পূর্ববাংলায় একটি “ডি-ফ্যাক্টো স্বায়ত্তশাসন” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল— যা বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সর্বাত্মক সমর্থনের প্রতিফলন।

কেননা, স্বাধীনতার ঘোষণা তিনিই দিতে পারেন যিনি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, এবং যাকে জনগণ তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি জনগণের আস্থা ও সমর্থন ছিল এতটাই দৃঢ় যে, তাঁকে কেন্দ্র করেই সমগ্র জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সংগঠিত হয়।

অসহযোগ আন্দোলনে তার আহ্বানে জনগণ শতভাগ সাড়া দিয়ে প্রমাণ করেন যে, তারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে রাষ্ট্রীয় মুক্তির একমাত্র বৈধ পথ বলে বিবেচনা করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম মঞ্চ কোনও নাট্যমঞ্চ নয় যে, যেকেউ উঠে এসে রাষ্ট্রের জন্ম ঘোষণা করবে। রাষ্ট্রগঠনের দায়িত্ব জনগণের অর্পিত নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তিতে স্থাপিত হয়— এবং সেই কর্তৃত্ব ওই সময়ে একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ধারণ করছিলেন।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিত “অপারেশন সার্চলাইট” পরিচালনা করলে পূর্ববাংলার ওপর আঘাত নেমে আসে— যা ছিল গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, নগর অবকাঠামো ধ্বংস এবং একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সামরিক অভিযান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অধ্যাপক ও ছাত্রদের হত্যা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ, পিলখানা ইপিআর সদর দফতরে নির্বিচার গণহত্যা—এসবই প্রমাণ করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল— এক ভয়াবহ দমন অভিযান চালিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করা।

সেই রাতেই প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসা থেকে গ্রেফতার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং তিন দিন পরে তাঁকে পাকিস্তানে পাঠানো হয়।

২৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন— যা আরও প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগই ছিল আসলে জনগণের অবিসংবাদিত নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার উপায়।

এই ভয়াবহ সামরিক হামলার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁর ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা প্রেরণ করেন, যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা—আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

” তিনি আরও আহ্বান জানান, বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছে, যা কিছু আছে তা নিয়েই যেন দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর গ্রেফতারের আগেই এই ঘোষণাটি ইপিআর’র বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পৌঁছে এবং পরে বিভিন্ন স্থানে প্রচারিত হয়। এই ঘোষণাটি নিছক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং বাঙালির সম্মিলিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় রূপ দেওয়ার একমাত্র বৈধ ও ন্যায্য ঘোষণা।

স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। এখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও তাঁর ওয়্যারলেস বার্তার অনুসরণে স্বাধীনতার ঘোষণা, সংবাদ এবং প্রতিরোধযুদ্ধ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেন এম. এ. হান্নান, সুলতানুল আলম, বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আল-ফারুক, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, কবি আবদুস সালাম, মাহমুদ হাসান এবং মেজর জিয়া। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রচার জনগণের মনোবল দৃঢ় করে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধকে সংগঠিত করে।

সেই দিনই আকাশবাণী কলকাতা সকাল ৯টায় ঘোষণা করে যে ঢাকাসহ পূর্ববাংলায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়ার এবিসি রেডিও ঢাকার গণহত্যার খবর প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।

স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তাঁর বই উইটনেস টু সারেন্ডার গ্রন্থে উল্লেখ করেন— প্রথম গুলি চলার মুহূর্তেই সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি বেতার তরঙ্গ থেকে শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

সালিক লিখেছেন, সেই কণ্ঠে পূর্ব পাকিস্তানকে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সালিক আরও উদ্ধৃত করেন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা: “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন… আপনারা প্রতিরোধ চালিয়ে যান, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে উৎখাত না করা পর্যন্ত সংগ্রাম থামবে না।” এই বিবরণ শুধু পাকিস্তানি প্রশাসনের সদস্যের প্রত্যক্ষ স্বীকারোক্তিই নয়, বরং স্বাধীনতার ঘোষণার সত্যতা প্রমাণে এক প্রামাণ্য দলিল।

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে আসা ঘোষণার সত্যতা তুলে ধরেন ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর দক্ষিণ এশিয়া সংবাদদাতা ডেভিড লোশাকও। তিনি জানান, ঘোষণাকারীর আওয়াজ ক্ষীণ হলেও তা নিঃসন্দেহে স্বাধীনতার ঘোষণাই ছিল, এবং সেটা সম্ভবত আগেই রেকর্ড করা ছিল— যা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক। কারণ ঢাকায় গণহত্যা ও সামরিক দমনাভিযানের মধ্যেও বেতার তরঙ্গ থেকে বার্তাটি প্রচারিত হয়েছিল।

২৬ ও ২৭ মার্চ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল প্রথম সারির খবর। দ্য টাইমস শিরোনাম দেয়: “শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করায় তীব্র যুদ্ধ শুরু।” ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখল: “স্বাধীনতার ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু।”

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, “স্বাধীনতা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস আরও স্পষ্টভাবে লেখে, “শেখ পূর্ব পাকিস্তানের ৭৫ মিলিয়ন মানুষকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

” অস্ট্রেলিয়ার দ্য এজ একই দিনে প্রতিবেদন করে, “আজ পূর্ব পাকিস্তান নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছে এবং শেখ মুজিব এই ঘোষণা দিয়েছেন।” এসব আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে, বিশ্ব সম্প্রদায় ২৬ মার্চকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনা এবং বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে বিবেচনা করেছে।

স্বাধীনতার ঘোষণা আইনি রূপ লাভ করে ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণা-পত্রে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সামরিক নেতৃত্ব নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই দলিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রত্বকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় বৈধতা প্রদান করে এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনী শক্তিকে সুসংহত করে।

এই সাংগঠনিক বৈধতার পর মুক্তিযুদ্ধ একটি সর্বাত্মক গণযুদ্ধে পরিণত হয়। সামরিক নেতৃত্বে জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যায়। জনগণের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, বেতার বার্তা এবং সশস্ত্র সংগ্রাম মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে ওঠে বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গণযুদ্ধ।

২৬ মার্চ তাই কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মপ্রকাশের অনির্বচনীয়, অনন্য এবং অনির্বাণ মুহূর্ত— যে মুহূর্তে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে এক জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজ হাতে রচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই দিনটি জন্ম দেয় এক নতুন রাষ্ট্রের, যার ভিত গড়ে ওঠে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের দৃঢ় ভিত্তির ওপর, জনগণের অবিচল আস্থায়, অহর্নিশ সংগ্রামে, নেতৃত্বের অনমনীয় দৃঢ়তায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তসিক্ত আত্মত্যাগে। ইতিহাসের নীরব দলিল, আন্তর্জাতিক গবেষণা, বিশ্বমাধ্যমের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন—সবকিছুই একক স্বরে ঘোষণা করে যে, স্বাধীনতার মূল ঘোষক, জাতির পথপ্রদর্শক এবং মুক্তির প্রথম কণ্ঠস্বর ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তাঁর উচ্চারিত সেই ক্ষীণ অথচ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো শক্তিশালী বার্তাই মুক্তিযুদ্ধের শপথ, আর ২৬ মার্চ ১৯৭১ সেই মুহূর্ত, যখন বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো বিশ্ব ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে।

লেখক: খায়ের মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।


Discover more from Jashore Khabor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

Table of contents [hide]

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন