নতুন বছর মানেই সাধারণত উৎসব, আনন্দ আর একটু উষ্ণতার প্রত্যাশা। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুটা কলকাতাবাসীর জন্য একেবারেই আলাদা। বছরের প্রথম দিনেই যেন শীত নিজের শক্তি দেখিয়ে দিল। ১৮ বছর পর এমন ঠান্ডা বর্ষবরণ আগে দেখেনি শহর। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই কনকনে হাওয়ার কামড়, গায়ে কাঁপুনি আর কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ—সব মিলিয়ে নতুন বছরের সকালটা বেশ হাড়কাঁপানোই ছিল।
কলকাতায় ১৮ বছরের মধ্যে শীতলতম ১ জানুয়ারি
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোরে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে দাঁড়ায় ১১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২.৬ ডিগ্রি কম। এত কম তাপমাত্রা ১ জানুয়ারিতে কলকাতায় শেষ বার দেখা গিয়েছিল ২০০৮ সালে। সেবার বছরের প্রথম দিনে পারদ নেমেছিল ১১.৪ ডিগ্রিতে।
তার পর দীর্ঘ ১৮ বছর কেটে গেলেও এমন শীতল বর্ষবরণ আর আসেনি। ২০২৬ সালের প্রথম দিনেই সেই পুরনো রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেল কলকাতার ঠান্ডা।
বুধবারই ছিল মরসুমের শীতলতম দিন
নতুন বছরের আগের দিন, অর্থাৎ বুধবারই মরসুমের শীতলতম দিনের সাক্ষী থেকেছে কলকাতা। বুধবার ভোরে শহরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার ভোরে তা সামান্য বেড়ে ১১.৬ ডিগ্রি হলেও শীতের দাপট একটুও কমেনি।
অনেকেই বলছেন, ভোরের দিকে বাইরে বেরোলে মনে হচ্ছিল যেন উত্তর ভারতের কোনও শহরে রয়েছেন। সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার—সব একসঙ্গে গায়ে চাপিয়েও ঠান্ডা সামলাতে কষ্ট হচ্ছিল।
নতুন বছরে শীতের দাপট থাকবে কত দিন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—এই শীত কি আরও বাড়বে, নাকি ধীরে ধীরে কমবে? এই নিয়ে আলিপুর আবহাওয়া দফতর কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে।
হাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী তিন দিন কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৩ ডিগ্রি কমতে পারে। অর্থাৎ, রাতের দিকে শীতের অনুভূতি আরও বাড়তে পারে। তবে এরপরের চার দিনে তাপমাত্রায় বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
সহজ ভাষায় বললে, আগামী সাত দিন শীত মোটামুটি একই রকম থাকবে। খুব বেশি বাড়বে না, আবার হঠাৎ কমেও যাবে না। এর পর আবার নতুন করে পারদপতনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
দক্ষিণবঙ্গে কুয়াশার দাপট বাড়বে
শীতের সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশাও বাড়ছে দক্ষিণবঙ্গে। আগামী চার থেকে পাঁচ দিন দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই কুয়াশার দাপট থাকবে বলে সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর।
বিশেষ করে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব বর্ধমান এবং পশ্চিম বর্ধমানে ঘন কুয়াশার সতর্কতা রয়েছে। শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় সকালের দিকে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে।
এই কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা অনেক জায়গায় কমে যেতে পারে। কোথাও কোথাও তা ৯৯৯ মিটার থেকে নেমে ২০০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সকালবেলায় গাড়ি চালানো বা ট্রেন চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
কলকাতার সকাল মানেই কুয়াশা আর ঠান্ডা
যাঁরা সকালে অফিস বা কাজে বের হন, তাঁদের জন্য এই কুয়াশা বেশ ভোগান্তির কারণ হতে পারে। রাস্তায় আলো কম দেখা যায়, দূরের কিছু স্পষ্ট বোঝা যায় না। অনেক জায়গায় সকালের সূর্য উঠতেও দেরি হচ্ছে।
শহরের পার্ক, ময়দান কিংবা লেক এলাকায় ভোরের দিকে হাঁটতে বেরোনো মানুষজনও শীত আর কুয়াশার মিলিত প্রভাব টের পাচ্ছেন। চা হাতে দাঁড়িয়ে গরম নেওয়ার দৃশ্য যেন এখন আরও বেশি চোখে পড়ছে।
উত্তরবঙ্গে কেমন থাকবে শীতের পরিস্থিতি
উত্তরবঙ্গেও শীতের দাপট কম নয়। যদিও আগামী কয়েক দিনে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় খুব বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে তার পরের চার দিনে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে পারে।
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও সকালের দিকে কুয়াশা থাকবে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও ডুয়ার্স অঞ্চলে কুয়াশার প্রভাব বেশি হতে পারে।
দার্জিলিং-কালিম্পংয়ে বৃষ্টি ও তুষারপাতের সম্ভাবনা
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতি ও শুক্রবার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং কালিম্পং জেলায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে দার্জিলিঙের পার্বত্য এলাকায় তুষারপাতও হতে পারে।
যাঁরা নতুন বছরের শুরুতে পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য এটা একদিকে যেমন আনন্দের খবর, তেমনই সাবধানতারও বিষয়। তুষারপাতের ফলে ঠান্ডা আরও বাড়বে, সেই সঙ্গে রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।
জানুয়ারিতে কি আরও পারদপতন হতে পারে
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ কাটার পর ফের এক দফা পারদপতনের সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর ভারতের দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়ার প্রবাহ আরও জোরালো হলে দক্ষিণবঙ্গেও শীত বাড়তে পারে।
মানে, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আবারও কনকনে ঠান্ডার দিন ফিরে আসতে পারে। যারা ভাবছিলেন নতুন বছরের সঙ্গে সঙ্গে শীত বিদায় নেবে, তাদের জন্য এই খবরটা একটু হতাশারই।
শীতের মরসুমে কীভাবে সতর্ক থাকবেন
এই কনকনে ঠান্ডায় বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। ভোর বা গভীর রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোই ভালো। গরম পোশাক পরা, কুসুম গরম জল পান করা আর ঠান্ডা লাগলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সকালের কুয়াশার কারণে যানবাহন চালানোর সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। ধীরে গাড়ি চালানো আর হেডলাইট ব্যবহার করা নিরাপদ।

