বিশ্বকাপ মানেই শুধু ক্রিকেট নয়। এটা আবেগ, রাজনীতি, টাকা আর প্রভাবের বড় মঞ্চ। আর সেই মঞ্চেই এবার এক অদ্ভুত নাটক। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে গিয়ে পাকিস্তান এমন এক সিদ্ধান্ত নিল, যার সবচেয়ে বড় চাপ এসে পড়ল বাংলাদেশের ওপরই। শুনতে একটু অদ্ভুত লাগছে, তাই না? কিন্তু ঘটনাটা ঠিক সেরকমই।
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলবে না পাকিস্তান। ঘোষণা এল সরকারের তরফ থেকে। কোনও স্পষ্ট কারণ নেই। আইসিসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেয়নি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু ইঙ্গিত পরিষ্কার। তারা দেখাতে চাইছে, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদেই এই অবস্থান।
মুখে বলা হয়নি, কিন্তু বার্তাটা জোরালো। পাকিস্তান বলতে চাইছে, “আমরা বাংলাদেশের পাশে আছি।” শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবটা একটু অন্যরকম।
বাংলাদেশ নিজে এই বয়কট চায়নি। বরং উল্টোটা। বিসিবি ভেতরে ভেতরে বেশ চিন্তায়। কারণ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। টিভি রেটিং আকাশছোঁয়া। বিজ্ঞাপনদাতারা মুখিয়ে থাকে। স্পনসররা বাড়তি টাকা ঢালে।
এই ম্যাচ না হলে ক্ষতি শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়। ক্ষতি পুরো ক্রিকেট বিশ্বের। আর সেই তালিকায় সবার আগে নামটা আসছে বাংলাদেশের।
আইসিসির আয়ের বড় অংশ আসে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে। সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ—সব কিছুর কেন্দ্রে এই ম্যাচ। যদি সেই ম্যাচ না হয়, আইসিসির মোট আয়ে বড় ধাক্কা লাগবে।
আর আইসিসির আয় কমলে কী হয়? সদস্য দেশগুলোর লভ্যাংশ কমে যায়। বাংলাদেশ যেহেতু আগেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে, তারা অংশগ্রহণের অর্থ পাচ্ছে না। তার ওপর যদি লভ্যাংশও কমে যায়, তাহলে চাপটা দ্বিগুণ হবে।
একজন বিসিবি কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভারত-পাক ম্যাচ বাতিল হলে বাংলাদেশের প্রাপ্ত অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এই ক্ষতি কেউই চায়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে না খেললে বিসিবির ক্ষতি প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা। এটা শুধু ম্যাচ ফি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সম্প্রচার, স্পনসর, বিজ্ঞাপন আর নানা বাণিজ্যিক সুযোগ।
এখন এর ওপর যদি আইসিসির ফান্ডেও টান পড়ে, তাহলে সেই ক্ষতির চাপ সামলাতে হবে বিসিবিকেই। সহজ ভাষায় বললে, যে ক্ষতটা শুকোয়নি, সেখানে আবার লবণ ছিটানো হচ্ছে।
ক্রিকেটবিশ্বে একটা কথা খুব চালু। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই সোনার ডিম পাড়া হাঁস। এই একটি ম্যাচ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাক ম্যাচ না হলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৫০০ কোটি টাকা। এই ক্ষতির ভাগ শুধু দুই দেশ নেবে না। এর প্রভাব পড়বে আইসিসি, সম্প্রচার সংস্থা, স্পনসর এবং অংশগ্রহণকারী সব দেশের ওপর।
বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে।
প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টেই একটা জিনিস চোখে পড়ে। ভারত আর পাকিস্তানকে একই গ্রুপে রাখা হয়। এটা কাকতালীয় নয়। এটা ব্যবসায়িক বাস্তবতা।
এই ম্যাচ থাকলে পুরো টুর্নামেন্টের উত্তেজনা বেড়ে যায়। দর্শক বাড়ে। বিজ্ঞাপন বিক্রি হয় বেশি। আইসিসির আয় বাড়ে। আর সেই আয়ের ভাগ পায় সব দেশ।
এবার যদি এই ম্যাচটাই না হয়, তাহলে গোটা পরিকল্পনাই ভেঙে পড়বে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাতে নেই। পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত তাদের অবস্থানে অনড়। আইসিসি মাঝখানে পড়ে গেছে।
আর বাংলাদেশ? তারা চুপচাপ বসে হিসেব কষছে। কতটা ক্ষতি হতে পারে। কীভাবে সেই ধাক্কা সামলানো যাবে।
এটা অনেকটা এমন, দু’জনের ঝগড়ায় তৃতীয় জনের পকেট কাটা পড়া।
পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে শক্ত বার্তা হতে পারে। কিন্তু ক্রিকেটের দুনিয়ায় আবেগের চেয়ে হিসেবটাই বড়। এখানে প্রতিটা ম্যাচ মানেই কোটি কোটি টাকা।
বাংলাদেশের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যদি বাংলাদেশেরই আর্থিক ক্ষতি হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। এই সমর্থন কতটা বাস্তবসম্মত?
এখনও অনেক কিছু পরিষ্কার নয়। আইসিসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা চাইবে না টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ম্যাচ বাতিল হোক।
চাপ বাড়বে পাকিস্তানের ওপর। আবার রাজনৈতিক জটিলতাও সহজে কাটবে না। এই টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ চাইবে অন্তত আর্থিক ক্ষতি যেন কম হয়।
পাকিস্তানের বয়কট সিদ্ধান্ত শুনতে বাংলাদেশের জন্য সমর্থনের বার্তা মনে হলেও বাস্তবে ছবিটা অনেক জটিল। এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে বাংলাদেশের ওপরই।
ক্রিকেট মাঠের বাইরে এই লড়াইয়ে কে জিতবে, সেটা এখনও বলা কঠিন। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার। ভারত-পাক ম্যাচ না হলে ক্ষতি শুধু দু’দেশের নয়। ক্ষতি পুরো ক্রিকেট বিশ্বের। আর সেই তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে একেবারে সামনের সারিতে।

