আমেরিকার রাজনীতি আর হলিউড, দুটোই যেন আবার এক সুতোয় বাঁধা পড়ল। সদ্য প্রকাশ্যে আসা কুখ্যাত এপস্টেইন ফাইলস নতুন করে আলোড়ন তুলেছে গোটা বিশ্বে। আর সেই নথির মধ্যেই উঠে এল বিশিষ্ট ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিচালক মীরা নায়ারের নাম। তিনি নিউ ইয়র্কের বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানির মা। এই খবর সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে মীরার যোগাযোগ ঠিক কতটা ছিল? তিনি কেন সেখানে গিয়েছিলেন? আর এর রাজনৈতিক প্রভাবই বা কী হতে পারে?
এপস্টেইন ফাইলস কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
শুক্রবার আমেরিকার বিচারবিভাগীয় দপ্তর প্রকাশ করেছে এপস্টেইন ফাইলসের বিশাল ভাণ্ডার। প্রায় ৩০ লক্ষ পাতার নথি, সঙ্গে দু’হাজারেরও বেশি ভিডিও এবং প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার ছবি। এই সব নথিতে উঠে এসেছে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম। রাজনীতিক, শিল্পপতি, তারকা—কেউই বাদ যাননি।
জেফ্রি এপস্টেইন ছিলেন এক কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারক। কিন্তু তার আসল পরিচয় হয়ে ওঠে শিশু পাচার ও যৌন অপরাধের ভয়ঙ্কর অভিযোগে। ২০১৯ সালে জেলে থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি ভাবে বলা হয় আত্মহত্যা, কিন্তু সন্দেহ আজও কাটেনি।
গিজলাইন ম্যাক্সওয়েলের পার্টি এবং মীরা নায়ারের উপস্থিতি
নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালে এপস্টেইনের প্রাক্তন প্রেমিকা ও সহযোগী গিজলাইন ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে একটি পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেই পার্টিতেই উপস্থিত ছিলেন মীরা নায়ার। দাবি করা হয়েছে, ওই সময় তাঁর ছবি ‘অ্যামেলিয়া’ মুক্তি পায়। ছবির প্রচারের কারণেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
এখানে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নথিতেই বলা হয়নি যে মীরা নায়ার কোনও বেআইনি কাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি ছিল একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে, যেখানে বহু পরিচিত মুখ হাজির ছিলেন।
পার্টিতে কারা কারা ছিলেন
এই পার্টির অতিথি তালিকা আরও চমকপ্রদ। সেখানে ছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ছিলেন আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস। অর্থাৎ এটি কোনও গোপন বৈঠক নয়, বরং প্রভাবশালীদের একটি খোলা সামাজিক জমায়েত।
পার্টির পর এপস্টেইনকে একটি ইমেল পাঠান পাবলিসিস্ট পেগি সিগল। সেই মেলেও মীরা নায়ারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে লেখা ছিল, মীরার ছবি সবার ভালো না লাগলেও মহিলাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছিল। এই মন্তব্য থেকেই বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
এপস্টেইন, ম্যাক্সওয়েল এবং আইনি পরিণতি
জেফ্রি এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই মারা যান। কিন্তু তাঁর সহযোগী গিজলাইন ম্যাক্সওয়েল এখনও জেলে। শিশু পাচার এবং যৌন অপরাধে সহায়তার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।
এপস্টেইন ফাইলসে শুধু মীরা নায়ার নন, নাম রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই ফাইলস আসলে কত বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে আমেরিকার রাজনীতিতে।
মীরা নায়ার: একজন পরিচালক থেকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে
মীরা নায়ার মানেই ‘মনসুন ওয়েডিং’, ‘দ্য নেমসেক’, ‘কুইন অফ কাটওয়ে’র মতো ছবি। মানবিক গল্প বলার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু গত বছর থেকে তিনি আরও বেশি করে আলোচনায় আসেন তাঁর ছেলের কারণে।
জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মীরা সংবাদমাধ্যমে ছেলের প্রশংসা করে বলেছিলেন, তিনি মানুষের সাম্য আর ন্যায়বিচারের পক্ষে। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছেলের রাজনীতির মূল কথা।
এপস্টেইন ফাইলস ও মামদানির রাজনীতি
এখন প্রশ্ন উঠছে, এই বিতর্ক কি মামদানির রাজনৈতিক ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলবে? আপাতত কোনও অভিযোগ নেই। শুধুমাত্র একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার তথ্যই সামনে এসেছে। তবুও রাজনীতিতে ধারণা অনেক সময় সত্যের থেকেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিরোধীরা এই বিষয়টি তুলে ধরতে পারে। সমর্থকেরা বলছেন, মীরার নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, অকারণে নাম টেনে আনা হচ্ছে। কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন, এপস্টেইনের মতো ব্যক্তির অনুষ্ঠানে যাওয়া আদৌ উচিত ছিল কি না।
একজন সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টা সহজ। কেউ যদি একটা পার্টিতে যান, পরে সেই আয়োজক ভয়ঙ্কর অপরাধী প্রমাণিত হন, তাহলে কি অতিথির দায় জন্মায়? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
এপস্টেইন ফাইলস ভবিষ্যতে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে
এপস্টেইন ফাইলস শুধু অতীতের কেচ্ছা নয়। এটি ক্ষমতা, প্রভাব আর নৈতিকতার সম্পর্ককে সামনে আনছে। কে কার সঙ্গে ওঠাবসা করছিল, আর কেন, এই প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে সবাইকে।
মীরা নায়ারের নাম জড়ানো মানেই তিনি অপরাধী, এমন দাবি করা যায় না। কিন্তু এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রভাবশালীদের কাছাকাছি থাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শেষ কথা
এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশের পর একের পর এক নাম সামনে আসছে। মীরা নায়ারের নামও তার ব্যতিক্রম নয়। আপাতত যা জানা যাচ্ছে, তা থেকে কোনও অপরাধের প্রমাণ মেলে না। তবে বিতর্ক থামার সম্ভাবনাও কম।
একটা বিষয় পরিষ্কার, এই ফাইলস আগামী দিনে আরও অনেক প্রশ্ন তুলবে। রাজনীতি, সিনেমা আর ক্ষমতার অন্ধকার দিক নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে। আর সেই আলোচনার মাঝখানেই থাকবেন মীরা নায়ার ও তাঁর পরিবার।

