বিশ্বকাপ মানেই উৎসব, উচ্ছ্বাস আর গ্যালারিভর্তি দর্শক। কিন্তু ইডেন গার্ডেন্সে এবারের বিশ্বকাপের শুরু যেন একেবারেই অন্যরকম। বিশাল স্টেডিয়াম, অথচ গ্যালারি প্রায় ফাঁকা। মাঠে চলছে বড় আসরের ম্যাচ, তবুও সেই চিরচেনা উত্তেজনা নেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের শহর কলকাতায় এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে।
প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং স্কটল্যান্ড। টস জিতে স্কটল্যান্ড শুরুতেই বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই যে বিষয়টি সবার নজর কাড়ে, তা হলো গ্যালারির শূন্যতা। এত বড় স্টেডিয়ামে হাতে গোনা কয়েক হাজার দর্শক বসে আছেন, যেন বিশ্বকাপ নয়, সাধারণ কোনো ম্যাচ চলছে।
ইডেন গার্ডেন্সের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার হাজার দর্শকের ঢেউ, উচ্ছ্বাস আর করতালি। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্য যেন হারিয়ে গেছে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দর্শকের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম ম্যাচের জন্য টিকিট বিক্রি হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার। এমনকি পরের ম্যাচগুলোর টিকিট বিক্রিও আশানুরূপ নয়।
এই শহর ক্রিকেট ভালোবাসে। এখানে ভারত না খেললেও সাধারণত গ্যালারি ভরে যায়। তাই এমন নীরবতা অনেকের কাছে অদ্ভুত লেগেছে। স্টেডিয়ামের বিশালতা আর গ্যালারির খালি আসন যেন পুরো পরিবেশটাকেই নিস্তেজ করে দিয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এই পরিস্থিতির বড় কারণ। অতীতে যখনই ইডেনে বাংলাদেশের ম্যাচ হয়েছে, তখন স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক দেখা গেছে। বাংলাদেশ থেকে যেমন মানুষ এসে খেলা দেখেছেন, তেমনি এপারের মানুষও উৎসাহ নিয়ে সমর্থন করেছেন। দুই বাংলার মানুষের আবেগ একসাথে মিশে গিয়েছিল গ্যালারিতে।
এই আবেগের কথা ভেবেই আয়োজকরা বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ইডেনে রেখেছিল। আশা ছিল, গ্যালারি ভরে যাবে দর্শকে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তব হলো না। বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ বয়কট করায় পুরো ছবিটাই বদলে গেছে।
অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু টুর্নামেন্টের নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ হারানো মানে নিজের অবস্থানও দুর্বল করে ফেলা।
বাংলাদেশের জায়গায় এবার সুযোগ পেয়েছে স্কটল্যান্ড। হয়তো তাদের সমর্থকের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে তারা অনেক সময় বড় দলগুলোকেও চমকে দিয়েছে। গত কয়েকটি বিশ্বকাপের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, স্কটল্যান্ড ধীরে ধীরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
শেষ তিনটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেখানে মোট সাতটি ম্যাচ জিতেছে, সেখানে স্কটল্যান্ড জিতেছে ছয়টি ম্যাচ। সংখ্যাটা কাছাকাছি হলেও, স্কটল্যান্ডের জয়গুলো ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তারা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়েছে। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও জয়ের স্বাদ পেয়েছে।
এই ইতিহাসই এখন তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। হঠাৎ করে বড় মঞ্চে সুযোগ পাওয়াটা সহজ নয়, কিন্তু স্কটল্যান্ড এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। দলের অধিনায়ক রিচি বেরিংটন টস জিতে বোলিং নেওয়ার পর জানান, তারা প্রস্তুত। এই সুযোগকে তারা হাতছাড়া করতে চায় না।
চার বছর আগে হোবার্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর স্মৃতি এখনো স্কটল্যান্ডের মনে তাজা। সেই ম্যাচ তাদের জন্য ছিল বড় প্রেরণা। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই তারা এবার মাঠে নেমেছে।
ছোট দল হিসেবে অনেক সময় চাপ বেশি থাকে। কিন্তু স্কটল্যান্ড এখন আর সেই পুরনো অবস্থায় নেই। তারা জানে, বিশ্বকাপে ভালো করলে পুরো বিশ্বের নজর কাড়তে পারবে। তাই তারা নিজেদের সেরাটা দিতে চাইছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজও কম যায় না। এই দলটির ক্রিকেট ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। তারা বহুবার বড় মঞ্চে নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে। ইডেন গার্ডেন্স তাদের জন্য একেবারে অপরিচিত মাঠ নয়। বরং এই মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের গৌরবের স্মৃতি।
দশ বছর আগে এই ইডেনেই তারা বিশ্বসেরা হওয়ার স্বাদ পেয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো দলের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করে। পুরনো সেই সাফল্য আবার ফিরিয়ে আনতে তারা মরিয়া।
এই ম্যাচে নামার আগে তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা জানে, স্কটল্যান্ডকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তাই শুরু থেকেই মনোযোগী হয়ে খেলতে চাইছে দলটি।
বিশ্বকাপ মানে সবসময় একটা উৎসবের আবহ। কিন্তু ফাঁকা গ্যালারি সেই জৌলুসকে অনেকটাই কমিয়ে দেয়। দর্শকের চিৎকার, হাততালি, উল্লাস—এসবই খেলোয়াড়দের বাড়তি শক্তি দেয়। যখন গ্যালারি প্রায় খালি থাকে, তখন সেই আবেগটাও যেন কমে যায়।
অনেকেই মনে করছেন, যদি বাংলাদেশ অংশ নিত, তাহলে দৃশ্যটা একেবারেই আলাদা হতো। কারণ বাংলাদেশের সমর্থকেরা সবসময় দলকে অনুসরণ করে। তারা দূরদেশেও গিয়ে দলকে সমর্থন করে। ইডেনের গ্যালারি তখন হয়তো রঙিন হয়ে উঠত।
এই ম্যাচটি শুধু একটি সাধারণ ম্যাচ নয়। স্কটল্যান্ডের জন্য এটি নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ। তারা দেখাতে চায়, সুযোগ পেলে তারাও বড় কিছু করতে পারে। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইছে নিজেদের পুরনো শক্ত অবস্থান ফিরিয়ে আনতে।
দুই দলের লক্ষ্যই আলাদা, কিন্তু চাওয়া একটাই—জয়। মাঠে তাই লড়াইটা জমে উঠেছে। একদিকে সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা, অন্যদিকে হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার লড়াই।
যারা ক্রিকেট ভালোবাসে, তারা জানে ইডেনের আবহ কেমন হয়। ভরা গ্যালারি, পতাকা, ঢাকের শব্দ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। এবারের চিত্রটা একটু আলাদা হলেও, খেলা তো থেমে নেই। মাঠে খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরাটা দিচ্ছেন।
হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শক বাড়বে, উত্তেজনাও ফিরবে। কারণ বিশ্বকাপ এমন এক আসর, যেখানে প্রতিটি ম্যাচেই নতুন গল্প তৈরি হয়।
ইডেনে বাংলাদেশহীন বিশ্বকাপের শুরুটা একটু নিস্তব্ধ মনে হলেও, মাঠের লড়াই কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়। স্কটল্যান্ড তাদের সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইছে পুরনো সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে।
দর্শক কম হলেও ক্রিকেটের উত্তেজনা কিন্তু থেমে নেই। খেলা যত এগোবে, ততই নতুন নাটক, নতুন গল্প সামনে আসবে। আর হয়তো কোনো একদিন আবার ইডেনের গ্যালারি ভরে উঠবে আগের মতো, করতালি আর উল্লাসে।

