মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগ মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক আর দর্শকদের শ্বাস আটকে দেওয়া লড়াই। ঠিক তেমনই এক ম্যাচ উপহার দিল গুজরাত জায়ান্টস ও দিল্লি ক্যাপিটালস। একদিকে শেষ ওভারে জয়ের স্বপ্ন দেখছিল দিল্লি, অন্যদিকে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে নিল গুজরাত। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩ রানের ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে মহিলাদের আইপিএলের পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল গুজরাত জায়ান্টস।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কখনও গুজরাত, কখনও দিল্লির দিকে দুলছিল ম্যাচের পাল্লা। এক সময় মনে হচ্ছিল দিল্লি সহজেই জিতে যাবে। আবার কয়েক ওভার পরেই পরিস্থিতি পুরো উল্টে যাচ্ছিল। শেষ ওভারের শেষ বল পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা বজায় ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতা আর নার্ভ ধরে রেখে শেষ হাসি হাসল গুজরাত জায়ান্টস।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে গুজরাত জায়ান্টস শুরুটা মোটেই ভালো করতে পারেনি। ওপেনার সোফি ডিভাইন মাত্র ১৩ রান করে দ্রুত ফিরে যান। শুরুতেই উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় দল। তবে ঠিক সেই সময় দায়িত্ব নেন বেথ মুনি ও অনুষ্কা শর্মা।
মুনি যেন একদম শান্ত ভঙ্গিতে ইনিংস গড়ে তুললেন। তিনি ৪৬ বলে ৫৮ রান করেন। ব্যাট থেকে আসে ৭টি ঝকঝকে চার। অন্য প্রান্তে অনুষ্কা শর্মা খেলেন সাহসী ইনিংস। তিন নম্বরে নেমে মাত্র ২৫ বলে ৩৯ রান করেন তিনি। ইনিংস জুড়ে ছিল ৮টি বাউন্ডারি। এই জুটিই গুজরাতকে আবার ম্যাচে ফিরিয়ে আনে।
মাঝের ওভারগুলোতে কিছুটা ধীর গতি এলেও শেষ দিকে বড় ভূমিকা নেন তনুজা কানওয়ার। ন’নম্বরে নেমে তিনি খেলেন ছোট কিন্তু কার্যকর ইনিংস। মাত্র ১১ বলে ২১ রান করেন তনুজা। তাঁর ব্যাটে ছিল ৩টি চার আর ১টি ছক্কা। এই রানগুলোই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফলে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। নির্ধারিত ২০ ওভারে গুজরাত জায়ান্টস ৯ উইকেটে তোলে ১৭৪ রান।
দিল্লি ক্যাপিটালসের বোলিংয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন শ্রী চরণী। ভারতীয় এই স্পিনার দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ দেখান। তিনি ৩১ রান দিয়ে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। তাঁর স্পেলেই গুজরাত বড় স্কোরের দিকে ছুটতে কিছুটা থমকে যায়।
এ ছাড়া চিনেলে হেনরি ৩৮ রানে ২টি উইকেট নেন। মারিজানে কাপ, নন্দিনী শর্মা ও মিনু মানি একটি করে উইকেট তুলে নেন। তবে শেষের দিকের রান আটকানো না যাওয়াতেই দিল্লিকে তুলনামূলক বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নামতে হয়।
১৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দিল্লির শুরুটা ছিল হতাশাজনক। একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে। শেফালি বর্মা ১৪, লিজেল লি ১১, জেমাইমা রদ্রিগেজ ১৬ রান করে ফিরে যান। এরপর মারিজানে কাপ শূন্য রানে আউট হলে চাপ আরও বেড়ে যায়। চিনেলে হেনরি করেন মাত্র ৯ রান। ৮৫ রানের মধ্যেই দিল্লির ৫ উইকেট পড়ে যায়।
এই মুহূর্তে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচ গুজরাতের হাতেই চলে গেছে।
চাপের মধ্যেও কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন লরা উলভার্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার এই ব্যাটার ২৩ বলে ২৪ রান করেন। ইনিংসটা খুব বড় না হলেও তিনি উইকেট আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান। তবে প্রয়োজনীয় রান রেট দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তাঁর পক্ষে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
শেষ দিকে ম্যাচে নতুন প্রাণ ফেরান নিকি প্রসাদ ও স্নেহ রানা। দু’জনেই ব্যাট হাতে যেন ভয়ডরহীন হয়ে ওঠেন। নিকি প্রসাদ খেলেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। তিনি ২৪ বলে ৪৭ রান করেন। ইনিংসে ছিল ৯টি চার। একের পর এক বাউন্ডারিতে গ্যালারিতে আশার আলো জ্বলে ওঠে।
অন্যদিকে স্নেহ রানা ১৫ বলে ২৯ রান করেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৩টি চার ও ২টি ছয়। শেষ ওভারে ঢোকার আগে দিল্লির সমর্থকেরা আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেন, ম্যাচ এখনও বাঁচানো সম্ভব।
২০তম ওভারের শুরুতেই তৈরি হয় বিতর্ক। স্নেহ রানার বিরুদ্ধে রান আউটের আবেদন ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। একাধিকবার টিভি রিপ্লে দেখার পর তৃতীয় আম্পায়ার তাঁকে নট আউট দেন। সেই সিদ্ধান্তে কিছুটা স্বস্তি পেল দিল্লি।
শেষ ওভারে দিল্লির দরকার ছিল ৯ রান। স্ট্রাইকে ছিলেন নিকি প্রসাদ। প্রথম কয়েকটি বলেই ম্যাচের রং পাল্টাতে পারতেন তিনি।
কিন্তু এখানেই নিজের আসল ক্লাস দেখান সোফি ডিভাইন। শেষ ওভারের চতুর্থ বলে তিনি স্নেহ রানাকে আউট করেন। তারপর শেষ বলে ৪ রান দরকার থাকাকালীন নিকি প্রসাদকে ফেরান। পুরো ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে ২টি উইকেট তুলে নেন ডিভাইন। এই ওভারই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
দিল্লি ক্যাপিটালস শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটে ১৭১ রানেই থেমে যায়। গুজরাত জয় পায় ৩ রানে।
সোফি ডিভাইন শুধু ব্যাটিং নয়, বোলিংয়েও ছিলেন গুজরাতের সেরা অস্ত্র। তিনি ৩৭ রান দিয়ে ৪টি উইকেট নেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিয়ে তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
রাজেশ্বরী গায়কোয়াড়ও দুর্দান্ত বোলিং করেন। তিনি ২০ রানে ৩টি উইকেট নেন। অ্যাশলে গার্ডনার ৩৭ রানে নেন ১টি উইকেট। সম্মিলিত এই বোলিং পারফরম্যান্সই গুজরাতকে জয়ের পথে নিয়ে যায়।
এই জয়ের ফলে মহিলাদের আইপিএলের পয়েন্ট টেবিলে গুজরাত জায়ান্টস দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে হাতছাড়া হওয়া এই ম্যাচ দিল্লি ক্যাপিটালসের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে রইল। এমন ম্যাচ যে কোনও দলের আত্মবিশ্বাসে বড় প্রভাব ফেলে।

