বিশ্ব ফুটবলে এখন যেন গুঞ্জনের মৌসুম। একদিকে লিয়োনেল মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সৌদি আরব ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। দুই মহাতারকার নাম জড়িয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ভক্তদের কৌতূহল কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যদিও আপাতত নিশ্চিত কিছু নয়, তবুও নানা সূত্রে উঠে আসা খবর ফুটবল দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে।
কিছু দিন আগেই ইন্টার মায়ামির সঙ্গে নতুন চুক্তি সই করেছেন লিয়োনেল মেসি। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত মায়ামিতেই থাকার কথা আর্জেন্টাইন মহাতারকার। সবকিছু ঠিকঠাক চলার কথা হলেও হঠাৎ করেই তাঁর ক্লাব বদলের গুঞ্জন শুরু হওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন।
মূলত এই জল্পনার উৎস আর্জেন্টিনা থেকেই। মেসির শৈশবের ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের এক শীর্ষ কর্তার মন্তব্য নতুন করে আলোচনার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা জানেন, বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার আগে মেসির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে রোসারিও শহরের এই ক্লাবেই।
নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের সহ-সভাপতি জুয়ান ম্যানুয়েল মেদিনা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে মেসিকে ক্লাবে ফেরানোর পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। তাঁর কথায়, এটি শুধু একজন খেলোয়াড়কে ফেরানো নয়, বরং পুরো ক্লাব, শহর এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে।
মেসি নিজেও অতীতে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ক্যারিয়ারের শেষের দিকে তিনি নিজের শৈশবের ক্লাবে খেলতে চান। অনেকটা সেই পুরোনো গল্পের মতো। বিদেশে বড় হওয়া কেউ যেমন একদিন নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চায়, ঠিক তেমনই মেসির হৃদয়ে নিউওয়েলসের টান আজও রয়ে গেছে।
এখানেই আসে বড় প্রশ্ন। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে ২০২৮ পর্যন্ত চুক্তি থাকার পরেও কীভাবে মেসি অন্য ক্লাবে খেলবেন? ফুটবলে এমন উদাহরণ নতুন নয়। স্বল্পমেয়াদি লোন চুক্তি বা বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য ক্লাবে খেলতে পারেন।
এই প্রসঙ্গেই সামনে এসেছে তুরস্কের ক্লাব গালাতাসারায়ের নাম। এক তুর্কি সাংবাদিক দাবি করেছেন, বিশ্বকাপের আগে নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে মেসি চার মাসের জন্য গালাতাসারেতে খেলতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১২টি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে, তবে কোনও অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলবেন না বলে শোনা যাচ্ছে।
বিশ্বকাপ মানেই মেসির জন্য আলাদা চাপ, আলাদা আবেগ। বয়স বাড়লেও তাঁর পারফরম্যান্সে এখনও ঘাটতি নেই। তবে শরীরের যত্ন আর ম্যাচ ফিটনেস ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ বা তুরস্কের মতো প্রতিযোগিতামূলক লিগে কিছুদিন খেলা তাঁকে সেই প্রস্তুতিতে সাহায্য করতে পারে।
অনেকটা এমন, যেমন কেউ বড় পরীক্ষার আগে আলাদা করে প্র্যাকটিস কোচিং নেয়। মেসির ক্ষেত্রেও বিষয়টা তেমনই হতে পারে।
এদিকে আরেক মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসেরের হয়ে খেলা এই পর্তুগিজ তারকা নাকি সৌদি সরকারের অধীনস্থ এক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট।
শোনা যাচ্ছে, ক্লাবগুলোর মধ্যে অর্থ বিনিয়োগ এবং সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে আল হিলালকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন রোনাল্ডো। এর প্রতিবাদ হিসেবে তিনি আল রিয়াধের বিরুদ্ধে একটি ম্যাচেও মাঠে নামেননি।
রোনাল্ডোর মতো খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে আবেগ আর সম্মান খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি তিনি মনে করেন, প্রতিযোগিতার পরিবেশ ন্যায্য নয়, তাহলে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই ক্ষোভ থেকেই তিনি সৌদি আরব ছাড়ার কথা ভাবতে পারেন।
তবে এখানেও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কোন ক্লাবে যাবেন, আদৌ যাবেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্য কোনও লিগ—সব সম্ভাবনাই আপাতত খোলা রয়েছে।
একই সময়ে মেসি ও রোনাল্ডোকে ঘিরে এমন খবর ফুটবল বিশ্বে আলাদা উত্তেজনা তৈরি করেছে। অনেক ভক্তই ভাবছেন, ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে দুই তারকাই হয়তো নতুন এক অধ্যায়ের কথা ভাবছেন। কেউ ফিরতে চাইছেন শিকড়ে, কেউ আবার সম্মানের প্রশ্নে নতুন পথ খুঁজছেন।
ফুটবল আসলে শুধু খেলা নয়। এটা আবেগ, স্মৃতি আর পরিচয়ের গল্প। মেসির জন্য নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ যেমন শৈশবের স্মৃতি, রোনাল্ডোর জন্য তেমনি সম্মান আর প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে মেসি কিংবা রোনাল্ডো—কেউই নিশ্চিতভাবে ক্লাব বদলাচ্ছেন না। তবে যে ইঙ্গিতগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে বড় কিছু ঘটতে পারে, এমন আশা করতেই পারেন ফুটবলপ্রেমীরা।
একটা সিনেমার ট্রেলারের মতো ব্যাপার। পুরো ছবি এখনও দেখানো হয়নি, কিন্তু যা দেখা গেছে, তাতে আগ্রহ বাড়ছে বৈ কমছে না। সময়ই বলবে, শেষ পর্যন্ত মেসি ফিরবেন কি না রোসারিওর মাঠে, আর রোনাল্ডো নতুন কোন জার্সিতে আবার আলো ছড়াবেন।

