ইউরোপের সেরা ক্লাব টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবার একেবারেই নতুন রূপে হাজির। পরিচিত গ্রুপ পর্বের বদলে লিগ-স্টাইল ফরম্যাট, যেখানে প্রতিটি ম্যাচই যেন ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ। বুধবার সন্ধ্যায় লিগ পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে—কারা সরাসরি নকআউটে, কারা প্লে-অফে, আর কারা বিদায়ের পথে।
এই পরিবর্তিত কাঠামো ইংলিশ ক্লাবগুলোর জন্য সুযোগ যেমন তৈরি করেছে, তেমনি চাপও বাড়িয়েছে কয়েক গুণ। আর্সেনাল ছাড়া প্রায় সবাই শেষ ম্যাচ পর্যন্ত টিকে থাকার লড়াইয়ে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, নতুন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফরম্যাটে প্রিমিয়ার লিগের বড় দলগুলোর অবস্থান, সম্ভাবনা এবং কী করতে হবে তাদের।
আগে গ্রুপ পর্ব মানেই ছিল ছয় ম্যাচে হিসাব মেলানো। এখন আট ম্যাচের লিগ পর্বে একাধিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি জয়, ড্র বা হার সরাসরি প্রভাব ফেলছে টেবিলের অবস্থানে। শীর্ষ আটে থাকলে সরাসরি শেষ ষোলো নিশ্চিত। ৯ থেকে ২৪-এর মধ্যে থাকলে খেলতে হবে নকআউট প্লে-অফ। আর ২৫-এর নিচে মানেই বিদায়।
এই কাঠামোতে গোল ব্যবধান, অ্যাওয়ে পারফরম্যান্স এবং বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আর্সেনাল এই মুহূর্তে প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও শীর্ষে। সাত ম্যাচে সাত জয়, ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, আর ইউরোপে নিজেদের আধিপত্যের বার্তা স্পষ্ট। বায়ার্ন মিউনিখের থেকে তিন পয়েন্ট এগিয়ে থেকে গানার্স কার্যত শীর্ষ দুই নিশ্চিত করে ফেলেছে।
এমিরেটস স্টেডিয়ামে শেষ ম্যাচে বড় কোনো অঘটন না ঘটলে আর্সেনাল শীর্ষ স্থানেই থাকবে। এর অর্থ, নকআউট পর্বে প্রতিটি দ্বিতীয় লেগ তারা খেলবে ঘরের মাঠে। ইউরোপের রাতে এমিরেটসের পরিবেশ যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা আলাদা করে বলার দরকার নেই।
লিভারপুলের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো, কিন্তু নিরাপদ নয়। টেবিলের চতুর্থ স্থানে থেকেও তারা জানে, একটি খারাপ ফল পুরো হিসাব বদলে দিতে পারে। কারাবাগের বিপক্ষে জয় তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
গোল ব্যবধানে তারা রিয়াল মাদ্রিদের পেছনে থাকলেও দ্বিতীয় স্থানে ওঠার তাত্ত্বিক সুযোগ এখনও রয়েছে। তবে সেই পথ কঠিন। বায়ার্নের হার, বড় গোল ব্যবধান—সব মিলিয়ে অনেক শর্ত পূরণ করতে হবে। আবার উল্টো দিকে, যদি ফলাফল বিপক্ষে যায়, তাহলে তারা ১৪তম স্থানে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতেও আছে।
লিভারপুলের লক্ষ্য পরিষ্কার। শীর্ষ চারে থাকা। এতে করে অ্যানফিল্ডে শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনালের সম্ভাব্য দ্বিতীয় লেগ নিশ্চিত হবে। ইউরোপীয় রাতে অ্যানফিল্ড মানেই বাড়তি এক খেলোয়াড়।
টটেনহ্যাম লিভারপুলের ঠিক পেছনে, মাত্র এক পয়েন্ট ব্যবধানে। ভালো ফল এলে তারা সরাসরি তৃতীয় স্থানে উঠে যেতে পারে। কিন্তু হার মানেই বড় ধাক্কা। একসঙ্গে অনেক ফল বিপক্ষে গেলে স্পার্সরা ১৬তম স্থানে নেমে যেতে পারে।
এই অবস্থান টটেনহ্যামের জন্য মানসিক পরীক্ষার। একদিকে শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন, অন্যদিকে প্লে-অফের কঠিন পথ। শেষ ম্যাচে তাই আক্রমণাত্মক কিন্তু হিসেবি ফুটবল খেলাই হবে তাদের চাবিকাঠি।
এই তিন দলই ১৩ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের মাঝামাঝি অবস্থানে। কিন্তু গোল ব্যবধান আর অন্যান্য ফলাফলের কারণে তাদের সম্ভাবনা আলাদা আলাদা।
চেলসি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও ধারাবাহিকতার অভাব আছে। ম্যানচেস্টার সিটি অভিজ্ঞ, কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে। নিউক্যাসল আবার ইউরোপের মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষুধায় ভরপুর।
তিন দলই জিতলে তৃতীয় স্থান পর্যন্ত উঠে যেতে পারে, যদি উপরের দলগুলো পয়েন্ট হারায়। আবার হার মানেই ১৭ বা ১৮তম স্থানে নেমে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি। তাই শেষ ম্যাচগুলো কার্যত ফাইনাল।
শীর্ষ আটে থাকলে সরাসরি শেষ ষোলো। এতে বাড়তি দুই ম্যাচের ঝামেলা নেই। ৯ থেকে ২৪-এর মধ্যে থাকলে খেলতে হবে নকআউট প্লে-অফ, যেখানে দুই লেগেই ভুলের সুযোগ কম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হোম অ্যাডভান্টেজ। শীর্ষে থাকা দলগুলো নকআউট পর্বের দ্বিতীয় লেগ খেলবে নিজেদের মাঠে। ইউরোপে এটি অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
প্লে-অফে লিগ পর্বের অবস্থান অনুযায়ী ম্যাচ নির্ধারিত হয়। নবম দল খেলবে ২৪তম দলের বিপক্ষে, দশম দল ২৩তম দলের সঙ্গে। এভাবে চলতে থাকবে ১৬ ও ১৭ নম্বর দলের ম্যাচ পর্যন্ত। অর্থাৎ যত ওপরে থাকা যাবে, তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের উত্তেজনা এখানেই শেষ নয়। সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় বড় রাত।
৩০ জানুয়ারি হবে প্লে-অফ ড্র।
১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি নকআউট প্লে-অফ।
১০ ও ১১ মার্চ এবং ১৭ ও ১৮ মার্চ শেষ ষোলোর লড়াই।
৭ ও ৮ এপ্রিল এবং ১৪ ও ১৫ এপ্রিল কোয়ার্টার ফাইনাল।
২৮ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৫ ও ৬ মে সেমিফাইনাল।
আর সবশেষে, ৩০ মে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে পুস্কাস এরিনায় মহারণ ফাইনাল।
নতুন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফরম্যাট প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর জন্য আশীর্বাদও, আবার অভিশাপও। আর্সেনাল ইতিমধ্যেই নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বাকিদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে স্নায়ুচাপের রাত। একটি গোল, একটি ভুল, কিংবা একটি অবিশ্বাস্য মুহূর্ত বদলে দিতে পারে পুরো মৌসুমের গল্প।
ইউরোপের মঞ্চে ইংলিশ ক্লাবগুলোর এই লড়াই শুধু ট্রফির জন্য নয়, মর্যাদা আর ভবিষ্যতের পথচলার জন্যও। এখন দেখার, শেষ বাঁশির পর কার মুখে হাসি, আর কার চোখে হতাশা।

