যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী–যদুনাথপুরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক—‘জিয়া খাল’। প্রায় ৫০ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে যে খাল খননের সূচনা করেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে আজ সেটি প্রায় মৃতপ্রায়।
তবে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে খালটির পুনঃখনন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে যশোর সফরে আসতে পারেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যদিও সফরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
উলাশী ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে খালের ধারে গাছতলায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা একটি ফলক স্তম্ভ, যা আজও বহন করছে একটি ঐতিহাসিক সূচনার সাক্ষ্য। কাছ থেকে পড়লে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর ‘উলাশী–যদুনাথপুর বেতনা নদী সংযোগ প্রকল্প’-এর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক এই প্রকল্পকে সে সময় সামাজিক আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই স্তম্ভের অপর পাশে খোদাই করা রয়েছে—“আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার আমাদের দেশ গড়বার”—যা ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের স্মারক হিসেবে সংযোজিত হয়।
ফলকের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একতলা পাকা ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। জানালা-দরজা নেই, ভেতরে পোকামাকড়ের বাসা। একসময় যেখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল, আজ তা ভেঙে পড়া স্মৃতির প্রতীক। পাশেই নতুন ভবনে চলছে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। প্রাচীরের ওপারেই রয়েছে সেই খাল, যার তলানিতে এখন সামান্য পানি, প্রবাহ নেই, প্রাণ নেই।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খননের কাজ শুরু হয়। নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে কাজের উদ্বোধন করেন জিয়াউর রহমান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে খনন কাজ সম্পন্ন হয় এবং ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় খালটির। এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি পরবর্তীতে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করে, যা ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
খাল খনন কর্মসূচির প্রত্যক্ষদর্শী শতবর্ষী আবদুল বারিক মণ্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে এসে স্কুল মাঠে নেমে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়িতে দেন এবং সেই ঝুড়ি তার ভাই করিম বকস মণ্ডলের মাথায় তুলে দেন। হাজার হাজার মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে খাল কাটার কাজে অংশ নেন। দুপুরে শুধু রুটি আর গুড় খেয়েই সবাই কাজ চালিয়ে যান। রাষ্ট্রপতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই মানুষ খাল কাটতে নেমে পড়েছিলেন।
একই ঘটনার সাক্ষী আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজ হাতে কাজ শুরু করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। তার ভাষায়, এটি ছিল মানুষের জন্য মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক অনন্য উদ্যোগ। তিনি জানান, তার বাবা করিম বকস মণ্ডল ইউপি সদস্য ছিলেন এবং তিনিই প্রথম ঝুড়ি মাটি মাথায় বহন করেন।
খাল খননের আগে উত্তর শার্শার পাঁচটি বড় বিলের প্রায় ২২ হাজার একর জমি বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকত। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতো এবং মানুষের জীবনযাত্রা ছিল দুর্বিষহ। খাল খননের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি হয় এবং জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় আসে। সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে খালের দুই পাশে প্রায় ২০টি পাম্প স্থাপন করা হয়। এর ফলে বোরো ধানের চাষ শুরু হয় এবং অঞ্চলটি ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
কিন্তু দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় খালটি এখন ভরাট হয়ে গেছে। পলি জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে খাল প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অনেক স্থানে এটি মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, খালটি পুনরায় খনন করা হলে কৃষকদের অনেক উপকার হবে। ফজলুর রহমান বলেন, আগে এই খালের কারণে জমি রক্ষা পেত, এখন পলি জমে পানি সরে না। মনিরুল ইসলাম মনি জানান, খালের পাড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ভবন ও ‘জিয়া মঞ্চ’ এখন বিলুপ্তির পথে, গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানিয়েছেন, খাল পুনঃখননের জন্য সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে, খাল পুনঃখননের উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, খালটি পুনরুজ্জীবিত হলে আবারও কৃষিতে গতি ফিরবে, জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং এলাকার অর্থনীতি চাঙা হবে। একই সঙ্গে এটি হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের পুনর্জাগরণ।

