ভূমিকম্প মানেই কয়েক সেকেন্ডের কাঁপুনি। কিন্তু অনেক মানুষের জন্য এর প্রভাব থেকে যায় অনেক দিন, এমনকি অনেক মাস। আপনি হয়তো চেয়ারে বসে আছেন, হঠাৎ মনে হলো মেঝে দুলছে। বুক ধড়ফড় করে উঠল। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, কেউ কিছু টেরই পায়নি। তখন বোঝা গেল, এটা আসলে ভূমিকম্প নয়। কিন্তু ভয়টা ছিল একদম সত্যি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একের পর এক ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার পর অনেক মানুষ এমন অদ্ভুত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবে কোনো কম্পন না থাকলেও শরীর আর মন যেন সেই ভয় বারবার ফিরিয়ে আনছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থার নাম সিসমোফোবিয়া।
সিসমোফোবিয়া হলো ভূমিকম্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক ধরনের তীব্র মানসিক ভীতি। এটি সাধারণ ভয়ের চেয়ে অনেক গভীর। এখানে মানুষ শুধু ভূমিকম্প হলে ভয় পায় না, বরং ভূমিকম্প না থাকলেও মনে হয় আবার কাঁপুনি শুরু হবে।
সহজ করে বললে, কম্পন শেষ হলেও মনের ভেতরের কম্পন থামে না। এই ভয় ধীরে ধীরে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডির রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা একে উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধি হিসেবেই দেখছেন।
ভূমিকম্পের সময় মানুষ চরম অসহায়ত্ব অনুভব করে। ভবন ভেঙে পড়তে পারে, জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে—এই চিন্তা মস্তিষ্কে গভীর ছাপ ফেলে। মস্তিষ্কের যে অংশ ভয় নিয়ন্ত্রণ করে, যাকে অ্যামিগডালা বলা হয়, সেটি তখন অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ফলে ভূমিকম্প শেষ হলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। সামান্য শব্দ, চেয়ারের নড়াচড়া, দূরের ভারী গাড়ির কম্পনকেও মস্তিষ্ক বিপদের সংকেত হিসেবে ধরে নেয়।
ঢাকার অনেক বাসিন্দাই বলছেন, অফিসে বসে বা বাসায় একা থাকলে হঠাৎ মনে হয় মেঝে দুলছে। বাস্তবে কিছুই হয় না, কিন্তু শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এই সমস্যার পেছনে শুধু মানসিক কারণই নয়, শারীরিক কারণও থাকতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, কানের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষাকারী তরল এন্ডোলিম্ফ ভূমিকম্পের ঝাঁকুনির পর কিছু সময় অস্থির থাকতে পারে। এর ফলে শরীরে দুলুনি বা ভারসাম্যহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়।
এই শারীরিক অনুভূতির সঙ্গে যদি মানসিক ভয় যোগ হয়, তাহলে সিসমোফোবিয়া আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে পোস্ট আর্থকোয়েক ডিজিনেস সিনড্রোমও বলা হয়।
ভূমিকম্পের পর টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর চারপাশের আলোচনায় যদি বারবার ধ্বংসের ছবি, ভয়ংকর গল্প আর আশঙ্কার কথা আসে, তাহলে সেই ভয় মানুষের মনে আরও গভীরভাবে বসে যায়।
বিশেষ করে যারা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় থাকেন বা যাদের আগের অভিজ্ঞতা বেশি ভয়াবহ ছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা। শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। হাত-পা কাঁপা। মাথা ঘোরা। কখনও কখনও প্যানিক অ্যাটাকও হতে পারে।
অনেকের রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। ঘুমের মধ্যেও মনে হয় আবার ভূমিকম্প হচ্ছে। কেউ কেউ একা থাকতে ভয় পান, বিশেষ করে ছোট বাচ্চা নিয়ে থাকলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
ভালো খবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিসমোফোবিয়া স্থায়ী হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে পেশাদার চিকিৎসা দরকার হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভয় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিন্তু একে অবহেলা করা ঠিক নয়।
সিসমোফোবিয়া মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতির একটি হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা সিবিটি। এই থেরাপিতে মানুষের অযৌক্তিক ভয়গুলো ধীরে ধীরে বাস্তব ও যৌক্তিক চিন্তার মাধ্যমে বদলে দেওয়া হয়।
আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো এক্সপোজার থেরাপি। এখানে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ বা দৃশ্যের মুখোমুখি করানো হয়। এতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শেখে যে সব সংকেত আসলে বিপজ্জনক নয়।
ভূমিকম্প নিয়ে প্রস্তুতি মানুষের ভয়ের বড় কারণ অনিশ্চয়তাকে কমিয়ে দেয়। একটি সাধারণ সেফটি কিট তৈরি করা। পরিবারকে নিয়ে করণীয় ঠিক করা। নিয়মিত ড্রিল করা। এসব কাজ মানুষের মনে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি ফিরিয়ে আনে।
যখন মানুষ জানে কী করতে হবে, তখন ভয় অনেকটাই কমে যায়।
জাপানের মতো দেশে ভূমিকম্প নিয়মিত হয়। কিন্তু সেখানে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে স্থায়ী সিসমোফোবিয়া দেখা যায় না। কারণ তারা ছোটবেলা থেকেই ভূমিকম্পের সঙ্গে বাঁচতে শেখে। প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ আর সচেতনতার কারণে ভূমিকম্প তাদের কাছে অজানা আতঙ্ক নয়।
বাংলাদেশেও যদি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা আর বাস্তবভিত্তিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মানুষের মধ্যে ভূমিকম্প ভীতি অনেকটাই কমে আসবে।
ভূমিকম্প শুধু মাটিকে কাঁপায় না, মানুষের মনকেও কাঁপিয়ে দেয়। সিসমোফোবিয়া সেই মানসিক কাঁপুনিরই একটি নাম। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
ভয়কে বুঝে, গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনে সাহায্য নিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন সুস্থ থাকলেই জীবন আবার আগের ছন্দে ফিরে আসে।

