মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কথা উঠলেই সাধারণত আমাদের মাথায় প্রথমে আসে তেল, গ্যাস কিংবা সামরিক শক্তির বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো আর শুধু জ্বালানি সম্পদ ঘিরে হবে না—তার সঙ্গে যুক্ত হবে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, আর সেটি হলো পানি।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন ধীরে ধীরে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এই সংঘাত যত জটিল হচ্ছে, ততই সামনে আসছে আরেকটি বাস্তবতা—পানি নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।
পৃথিবীর মোট মিষ্টি পানির খুবই সামান্য অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলে রয়েছে। হিসাব করলে দেখা যায়, বিশ্বের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ মিঠা পানি এই অঞ্চলে পাওয়া যায়। ফলে এখানকার দেশগুলোর জন্য স্বাভাবিক নদী বা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করা খুবই কঠিন।
এই কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করার প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ডেসালিনেশন বা লবণমুক্তকরণ।
১৯৫০ সালের পর থেকে যখন তেল শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে, তখন এই অঞ্চলের জনসংখ্যা, শিল্প এবং কৃষি কার্যক্রমও দ্রুত বাড়তে থাকে। এর ফলে সীমিত মিঠা পানির ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
বর্তমানে অনেক দেশ তাদের পানির বড় অংশই সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানিই আসে এই প্রক্রিয়া থেকে। ওমানে প্রায় ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪২ শতাংশ পানির উৎসও একই প্রযুক্তি।
২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করেছিল। এত বিপুল পরিমাণ পানি দিয়ে হাজার হাজার বড় সুইমিং পুল ভরানো সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ইতিমধ্যে অনেক নিচে নেমে গেছে। আগে যে পানি কৃষি সেচে ব্যবহার করা হতো, এখন তার অনেকটাই কমে গেছে।
ফলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট ও পানি সরবরাহ অবকাঠামোর গুরুত্ব অত্যন্ত বেড়ে গেছে। এই অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েকটি দেশের বড় শহর পর্যন্ত পানি সংকটে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঠিক এই কারণেই পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে এখন একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বাহরাইন অভিযোগ করেছে যে তাদের একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টের ওপর সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান বলছে, তারাও আগে আক্রমণের শিকার হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি পানি স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছিল বলে তারা দাবি করেছে।
এদিকে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের কাছে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডেসালিনেশন প্ল্যান্টের কাছাকাছি এলাকায়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাত অঞ্চলের একটি পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
কুয়েতের দোহা ওয়েস্ট প্ল্যান্টেও ক্ষতির খবর পাওয়া যায়, যদিও সেখানে সরাসরি হামলা হয়নি। কাছাকাছি একটি বন্দরে ড্রোন হামলার ফলে উড়ে আসা ধ্বংসাবশেষ ওই স্থাপনায় আঘাত হানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হামলার পেছনে একটি বড় কৌশল থাকতে পারে। সরাসরি বড় সামরিক শক্তির সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে লক্ষ্য করা এখন অনেক দেশের কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা বা হামলার আশঙ্কা তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে সরকারগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ে।
এই ধরনের কৌশলের উদ্দেশ্য হতে পারে যুদ্ধের গতিপথকে অন্যভাবে প্রভাবিত করা।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে সাধারণত বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা নিষিদ্ধ। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা হাসপাতালের মতো স্থাপনাগুলোকে যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বাস্তবে অনেক সময় দেশগুলো নিজেদের পদক্ষেপকে প্রতিশোধ বা আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান নিজেও বড় ধরনের পানি সংকটের মুখোমুখি।
দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে কম বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে পানি পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
কিছু নদীর পানির প্রবাহ কমে গেছে, অনেক বাঁধে পানির স্তর উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। লেক উর্মিয়ার মতো বড় জলাশয়ও আগের তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে।
কিছু এলাকায় এত বেশি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়েছে যে মাটির স্তর পর্যন্ত বসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে রাজধানী তেহরানেও পানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হতে পারে।
ইরানের পানিসংক্রান্ত সমস্যাগুলো শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও পানিবণ্টন নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
আফগানিস্তানের সঙ্গে হেলমন্দ নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ আছে। আবার তুরস্কের বাঁধ নির্মাণের কারণে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানির প্রবাহ নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইরাকের সঙ্গেও কয়েকটি যৌথ জলপথ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায় পানি সরবরাহ কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
আগে যেখানে তেল ও গ্যাস ছিল প্রধান ভূরাজনৈতিক শক্তি, এখন সেখানে পরিবেশগত চাপও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতের সংঘাত হয়তো শুধু তেলের ট্যাঙ্কার বা গ্যাস পাইপলাইন ঘিরে হবে না। নদী, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস এবং ডেসালিনেশন প্ল্যান্টও তখন কৌশলগত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
এক সময় হয়তো এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন পানির মূল্য তেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আর তখন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা হবে—যেখানে পানি শুধু জীবনধারণের উৎস নয়, বরং শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক হাতিয়ারও।
অতিরিক্ত প্রতিবেদন : বিবিসি নিউজ ফার্সি।



