পারস্যে রবীন্দ্রনাথ: রক্তাক্ত ইরানে শান্তির স্বপ্ন ও সভ্যতার সংকটের চিরন্তন বার্তা

পারস্য—আজকের ইরান—শুধু একটি দেশ নয়, হাজার বছরের সভ্যতা, সংস্কৃতি আর কাব্যের এক অনন্য ভাণ্ডার। আর এই দেশটির সঙ্গে গভীর এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর।

তিনি সেখানে গিয়েছিলেন কেবল একজন অতিথি হয়ে নয়, বরং একজন শান্তির দূত হিসেবে। আজ যখন ইরান বারবার সংঘাত আর রক্তপাতের খবরের শিরোনামে উঠে আসে, তখন কবির সেই শান্তির বারিধারার স্বপ্ন আরও বেশি করে মনে পড়ে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর হাতে ফারসি ভাষায় অনূদিত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি দেখে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন—তিনি এক শক্তিশালী চিন্তার প্রতীক। অনেকেই তাঁর প্রেমের কবিতা পছন্দ করেন, কিন্তু অনেকে আবার তাঁর প্রতিবাদী রূপে বেশি অনুপ্রাণিত হন।

কারণটা খুব সহজ। তিনি কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। নিজের সুবিধার জন্য নীতিকে বিক্রি করেননি। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি যখন ‘সভ্যতার সংকট’ লেখেন, তখন আসলে তিনি একটা বড় সত্য তুলে ধরেন—সভ্যতার নামে মানুষ কীভাবে লোভ, যুদ্ধ আর শোষণের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।

আজকের পৃথিবীতে তাকালেই বোঝা যায়, কথাগুলো কতটা সত্যি ছিল।

১৯৩২ সালে ইরানের সম্রাট রেজা শাহ পহলভি রবীন্দ্রনাথকে পারস্য সফরের আমন্ত্রণ জানান। সেই সময় ইরান চাইছিল বিশ্বের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে, আর তারা মনে করেছিল—এই কাজের জন্য রবীন্দ্রনাথই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

কারণ তখন তিনি শুধু একজন কবি নন, এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবেও বিশ্বজোড়া পরিচিত।

ইরানের মানুষের মধ্যেও তাঁর প্রতি আগ্রহ ছিল অনেক আগে থেকেই। ১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার পর তাঁর লেখা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে সেখানে পৌঁছায়। এমনকি মুহাম্মদ তাকি খান পিসিয়ান প্রথম ফারসিতে তাঁর কবিতা অনুবাদ করেন।

জীবনে মাত্র দু’বার বিমানে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দ্বিতীয়বারের সেই যাত্রা ছিল ইরানের উদ্দেশে। ৭০ বছর বয়সে এই সফর তাঁর জন্য ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।

কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করে এলাহাবাদ, করাচি হয়ে তিনি পৌঁছান বুশেহর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহচর।

ভাবতে পারো, তখন বিমানযাত্রা কতটা অচেনা আর রোমাঞ্চকর ছিল!

ইরানে পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ যে সম্মান পেয়েছিলেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তেহরান থেকে শিরাজ—সব জায়গাতেই মানুষ ভিড় করত শুধু এক ঝলক তাঁকে দেখার জন্য।

শিরাজে বিখ্যাত ফারসি কবি শেখ সাদি-র মাজারে তাঁর জন্মদিন উদযাপন করা হয়। এত বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিল যে, ভিড় সামলাতে সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছিল।

এটা শুধু একজন কবির প্রতি সম্মান নয়—এটা ছিল সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।

রবীন্দ্রনাথ শুধু মানুষের ভালোবাসায় নয়, ইরানের প্রকৃতিতেও মুগ্ধ হয়েছিলেন। ছোট ছোট পাহাড়, গোলাপের বাগান, আর বেগুনি রঙের জাফরান ফুল—সবকিছু যেন তাঁকে এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে গিয়েছিল।

আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত খবরের সঙ্গে সেই শান্ত, সুন্দর ইরানকে মিলিয়ে দেখা সত্যিই কঠিন।

শিরাজে গিয়ে প্রিয় কবি হাফেজ-এর সমাধির পাশে বসে রবীন্দ্রনাথ এক গভীর অনুভূতির মধ্যে ডুবে যান। তিনি মনে করেছিলেন, শত বছর পেরিয়ে হলেও কবিদের মধ্যে এক অদৃশ্য যোগসূত্র থেকে যায়।

সেখানে বসে তিনি যেন সময়ের সীমা পেরিয়ে আরেক কবির সঙ্গে কথা বলছিলেন।

স্থানীয়দের বিশ্বাস ছিল—হাফেজের কাব্যগ্রন্থ স্পর্শ করে কিছু চাইলে তা পূরণ হয়। হয়তো সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথও একটাই কামনা করেছিলেন—মানুষ যেন ধর্মের অন্ধতা আর বিভাজন থেকে মুক্তি পায়।

রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি আসলে শুধু তাঁর সময়ের জন্য নয়, সব সময়ের জন্যই লেখা। তিনি দেখেছিলেন, মানুষ উন্নতির নামে নিজের মানবিকতা হারিয়ে ফেলছে।

আজকের পৃথিবী দেখলে কি একই জিনিস চোখে পড়ে না?

যুদ্ধ, আগ্রাসন, ক্ষমতার লড়াই—সবকিছুর মাঝে মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

রবীন্দ্রনাথ শুধু সফর করেই থেমে থাকেননি। তিনি ভারত ও ইরানের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

তাঁর উদ্যোগে ইরানি পণ্ডিত ইব্রাহিম পুরদাউদ শান্তিনিকেতনে এসে পড়াশোনা করান। এর মাধ্যমে দুই দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে এক নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়।

Images 10000 02

পরে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে শিরাজের একটি স্কুলের নাম পরিবর্তন করে ‘টেগোর হাই স্কুল’ রাখা হয়—যা আজও সেই বন্ধনের প্রতীক।

পারস্যে থাকাকালীনই তিনি লেখেন ‘পারস্যে জন্মদিনে’ কবিতাটি। সেই কবিতার শেষ লাইনে ছিল—“ইরানের জয় হোক”।

আজকের প্রেক্ষাপটে এই লাইনটি যেন আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ এটি শুধু একটি দেশের জন্য শুভকামনা নয়, বরং শান্তি, মানবতা আর সহাবস্থানের এক গভীর আহ্বান।

রবীন্দ্রনাথ যে ইরান দেখেছিলেন, তা ছিল সৌন্দর্য, সংস্কৃতি আর মানবিকতার এক মেলবন্ধন। আর আজ আমরা যে ইরান দেখি, তা অনেকটাই ভিন্ন—সংঘাত আর অনিশ্চয়তায় ভরা।

তবুও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—কবির সেই শান্তির স্বপ্ন কি একদিন আবার ফিরে আসবে?

হয়তো আসবে। কারণ ইতিহাস বলে, যত অন্ধকারই নেমে আসুক, মানুষের ভেতরের আলো কখনও পুরোপুরি নিভে যায় না। আর সেই আলোই একদিন আবার শান্তির পথ দেখাবে।

লিখছেন সৌমেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

লেটেস্ট আপডেট

আইপিএলে নতুন কড়াকড়ি! টিম বাস বাধ্যতামূলক, জার্সি ভুল হলে শাস্তি

ক্রিকেট মানেই শুধু ব্যাট-বল আর মাঠের লড়াই নয়, এর...

ল্যান্ডিংয়ের সময় ভয়ংকর দুর্ঘটনা! এয়ার কানাডা বিমানের সঙ্গে ফায়ার ট্রাকের সংঘর্ষ

রাতের আকাশে সবকিছু তখন স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। যাত্রীরা ভাবছিলেন,...

হরমুজ সংকট: শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প! যুদ্ধ নাকি নতুন কৌশল?

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত। Iran এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে...

ইরান কি সত্যিই ছাড়ছে পরমাণু অস্ত্র? ট্রাম্পের দাবিতে চমক বিশ্বজুড়ে!

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন...

৭-০ ইস্টবেঙ্গলের গোলবন্যায় ভেসে গেল মহামেডান: অবিশ্বাস্য ম্যাচ হাইলাইটস

ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল)-এর মঞ্চে এক কথায় ঝড় তুলে...

বাছাই সংবাদ

আইপিএলে নতুন কড়াকড়ি! টিম বাস বাধ্যতামূলক, জার্সি ভুল হলে শাস্তি

ক্রিকেট মানেই শুধু ব্যাট-বল আর মাঠের লড়াই নয়, এর...

ল্যান্ডিংয়ের সময় ভয়ংকর দুর্ঘটনা! এয়ার কানাডা বিমানের সঙ্গে ফায়ার ট্রাকের সংঘর্ষ

রাতের আকাশে সবকিছু তখন স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। যাত্রীরা ভাবছিলেন,...

হরমুজ সংকট: শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প! যুদ্ধ নাকি নতুন কৌশল?

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত। Iran এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে...

ইরান কি সত্যিই ছাড়ছে পরমাণু অস্ত্র? ট্রাম্পের দাবিতে চমক বিশ্বজুড়ে!

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন...

৭-০ ইস্টবেঙ্গলের গোলবন্যায় ভেসে গেল মহামেডান: অবিশ্বাস্য ম্যাচ হাইলাইটস

ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল)-এর মঞ্চে এক কথায় ঝড় তুলে...

চোখের সামনে দাউদাউ আগুন! যশোরে মাইক্রোবাসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রোহিতা রাজবাড়ি গ্রামে একটি চলন্ত মাইক্রোবাসে...

‘ধুরন্ধর ৩’ কি সত্যিই আসছে? জুনে ফের ‘হামজা’ ঝড়ের গুঞ্জন

সিনেমা হলে ঢুকলেই এখন একটাই নাম চারদিকে ঘুরছে—ধুরন্ধর: দ্য...

‘শম্পা’ নিয়ে আতঙ্ক—সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদ! বিশেষজ্ঞরা বলছেন কী?

গত কয়েকদিন ধরে সোশাল মিডিয়ায় এক অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি