ইরান-আমেরিকা সংঘাতের পর বিশ্ব রাজনীতি বদলাচ্ছে- লাভে ভারত?

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র কখনো স্থির থাকে না। একেকটি যুদ্ধ, একেকটি সংঘাত বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দেয় ধীরে ধীরে। সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকা সংঘাত সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি বড় উদাহরণ।

এই সংঘাত শুধু সামরিক দিক থেকে নয়, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকার প্রতি যে আস্থা ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। আর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত একটি নতুন সুযোগ দেখতে শুরু করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা নিজেকে সুপারপাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তেহরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে এবং এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর নিহত হন।

এর জবাবে ইরান শুধু ইজরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার ঘাঁটিগুলোর উপর পাল্টা হামলা চালায়। কুয়েত, বাহরিন, ওমান, জর্ডন, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীসহ একাধিক দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পুরো অঞ্চল যুদ্ধের আগুনে জ্বলতে থাকে।

এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ভাবতে বাধ্য করেছে—তাদের নিরাপত্তা কি সত্যিই নিশ্চিত?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার উপর নির্ভর করে এসেছে। কিন্তু এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, সেই নির্ভরতা সবসময় নিরাপদ নয়।

প্রথমত, আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ইরানের পাল্টা আক্রমণ ঠেকানো যায়নি। দ্বিতীয়ত, এই সংঘাত অনেক দেশকে সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যারা মূল যুদ্ধে সরাসরি জড়িত ছিল না। ফলে তারা এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করতে চাইছে।

সহজভাবে বললে, আগে তারা ভাবত “আমেরিকা আছে, তাই ভয় নেই।” এখন তারা ভাবছে, “আমাদের নিজেদের শক্তি কতটা?”

যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াবে, তা প্রায় নিশ্চিত। তারা এখন বুঝতে পারছে, শুধু বাইরের শক্তির উপর নির্ভর করলে চলবে না। নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আরও শক্তিশালী করতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে তারা যেসব খাতে বেশি গুরুত্ব দেবে:

  • উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি
  • ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
  • আধুনিক যুদ্ধবিমান
  • নৌসামরিক শক্তি বৃদ্ধি

একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরুন, আপনার বাড়ির নিরাপত্তা সবসময় প্রতিবেশীর উপর নির্ভর করে ছিল। কিন্তু একদিন বুঝলেন, প্রতিবেশী সবসময় সাহায্য করতে পারবে না। তখন আপনি নিজেই তালা, সিসিটিভি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াতে শুরু করবেন। ঠিক একই কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত কৌশলগতভাবে এগোতে শুরু করেছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনকে আরও শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদনে ভারতকে একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে:

  • ২০১৪-১৫ সালে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ছিল প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১.২৭ লক্ষ কোটি টাকা
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পৌঁছেছে ১.৫৪ লক্ষ কোটি টাকায়
  • প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০১৪ সালে ছিল মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার কোটিরও বেশি

এই বৃদ্ধি শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়, এটি ভারতের আত্মনির্ভরতার প্রতিফলন।

ভারতের “আত্মনির্ভর ভারত” উদ্যোগ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে ভারত অধিকাংশ অস্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করত, এখন ধীরে ধীরে নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর ফলে দুটি বড় সুবিধা হচ্ছে:

একদিকে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান তৈরি হচ্ছে।

ভারত এখন শুধু নিজের জন্য নয়, অন্য দেশগুলোর জন্যও অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ করতে প্রস্তুত হচ্ছে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কাতার—সব দেশই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

এই সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও অত্যন্ত মজবুত। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভারত সহজেই এগিয়ে যেতে পারে।

একটু সহজভাবে বললে, বাজারে ঢোকার জন্য শুধু ভালো পণ্যই যথেষ্ট নয়, দরকার ভালো সম্পর্কও। ভারতের কাছে এই দুইটাই আছে।

ভারত শুধু বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায় না, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও করছে। সরকারের লক্ষ্য:

  • চলতি অর্থবছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ১.৭৫ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত করা
  • ২০২৯ সালের মধ্যে তা ৩ লক্ষ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া

এই লক্ষ্য অর্জন হলে ভারত বিশ্ব প্রতিরক্ষা বাজারে একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসবে।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে—“পৌষমাস”, অর্থাৎ সুযোগের সময়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত ঠিক সেই সুযোগটাই দেখতে পাচ্ছে।

কারণ:

  • আমেরিকার উপর আস্থা কমছে
  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নতুন সরবরাহকারী খুঁজছে
  • ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে
  • কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যেই ভালো

সব মিলিয়ে, এটি ভারতের জন্য এক ধরনের “পারফেক্ট টাইমিং”।

লেটেস্ট আপডেট

“৫ মিনিটে ফ্রেশ লুক! LED আই মাস্কে চোখের যত্ন এখন ঘরেই”

আজকাল স্কিনকেয়ার মানেই শুধু ক্রিম বা সিরাম নয়—টেকনোলজিও এখন...

সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার আহ্বানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা

পবিত্র ঈদুল ফিতর—শুধু আনন্দের দিন না, এটা আমাদের ভেতরের...

খাবারের আঁশ কি সত্যিই মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ করে? চমকে দেওয়া নতুন তথ্য!

খাদ্যের সাথে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বেশ জোড়ালো হলেও কতজনই-বা তা...

চোখের সামনে ভাসমান দাগ বা ফ্লোটার: কখন স্বাভাবিক, আর কখন বিপদের সংকেত?

চোখের সামনে হঠাৎ সুতো, জাল বা ছোট ছোট কালো...

বাংলায় তাণ্ডব! ৯ জেলায় শিলাবৃষ্টি, ৮০ কিমি গতির ঝড়

রাজ্যের আবহাওয়া এখন একেবারেই স্থির নয়—একটু রোদ, একটু মেঘ,...

বাছাই সংবাদ

“৫ মিনিটে ফ্রেশ লুক! LED আই মাস্কে চোখের যত্ন এখন ঘরেই”

আজকাল স্কিনকেয়ার মানেই শুধু ক্রিম বা সিরাম নয়—টেকনোলজিও এখন...

খাবারের আঁশ কি সত্যিই মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ করে? চমকে দেওয়া নতুন তথ্য!

খাদ্যের সাথে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক বেশ জোড়ালো হলেও কতজনই-বা তা...

বাংলায় তাণ্ডব! ৯ জেলায় শিলাবৃষ্টি, ৮০ কিমি গতির ঝড়

রাজ্যের আবহাওয়া এখন একেবারেই স্থির নয়—একটু রোদ, একটু মেঘ,...

অপারেশন ছাড়াই ব্রেন টিউমার শনাক্ত! নতুন যুগের চিকিৎসা পদ্ধতি লিকুইড বায়োপসি

মস্তিষ্কে কোনও সমস্যা হলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই ভয় পাই। বিশেষ...

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: এলএনজি বন্ধ হলে বাংলাদেশ কতটা বিপদে?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অস্থিরতা চলছে বৈশ্বিক জ্বালানি...

১ দিনেই ২০০+ কোটি! ‘ধুরন্ধর ২’ ভেঙে দিল পুষ্পা, কেজিএফ, বাহুবলী সব রেকর্ড

বলিউডে অনেক দিন ধরেই একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—আবার কবে হিন্দি...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি