আসন্ন নির্বাচনী প্রচারণা মানেই পোস্টার, মাইক আর সভা, এই চেনা ছবিটা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কম সময়ে, কম খরচে, চোখ ধাঁধানো ভিডিও বানিয়ে জনমত প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করেছে এই প্রযুক্তি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই সুবিধার আড়ালে বাড়ছে বিভ্রান্তি, আক্রমণ আর অপপ্রচার। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এআই ভিডিও দিয়ে চলা এই প্রচারণা কি নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ করছে, নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে?
বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে জাতীয় নির্বাচনে এর এমন ব্যাপক উপস্থিতি এবারই প্রথম। প্রচারণার ভিডিওতে নেতাদের মুখ, কণ্ঠ, এমনকি বক্তব্যও এআই দিয়ে বানানো হচ্ছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে সমর্থনের বার্তা, আবার কোথাও সরাসরি প্রতিপক্ষকে হেয় করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করলেই এসব ভিডিও চোখে পড়ছে। অনেক সময় বোঝার উপায়ও থাকছে না—ভিডিওটা আসল, নাকি পুরোপুরি কৃত্রিম।
বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন, এআই নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। সেই সতর্কতা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশন আচরণবিধিতেও এআই সংক্রান্ত নির্দেশনা যোগ করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিধি থাকলেও প্রয়োগ আর নিয়ন্ত্রণে বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
নির্বাচনী মৌসুমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান নাকি জনসাধারণের কাছে বিকাশ নম্বর দিয়ে সাহায্য চাইছেন। ভিডিওটি ছিল সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি। এটি একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই লাখ লাখ মানুষ দেখে ফেলে।
এটা কোনো একক ঘটনা নয়। এমন অসংখ্য ভিডিও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ভিডিওর লক্ষ্য একটাই, আবেগে নাড়া দেওয়া। মানুষ যখন দ্রুত দেখে, তখন যাচাই করার সময় পায় না। ফলাফল হিসেবে ভুল তথ্য খুব সহজেই সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব মাত্র ১৫ দিনে প্রকাশিত ৮০০টির বেশি এআই ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ভিডিওতে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ, এমনকি সরকারি ব্যক্তিত্বদেরও ব্যবহার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ভিডিওতেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বার্তা ছড়ানো হয়েছে।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, এআই কন্টেন্ট কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। এটি পরিকল্পিত এবং সংগঠিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে। ডিজিটাল অ্যালগরিদমও এই কন্টেন্টকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
নির্বাচনী আচরণবিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, কোনো প্রার্থী বা দল বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা বা মানহানিকর কন্টেন্ট ছড়াতে পারবে না। এআই ব্যবহার করে ভিডিও বানানো নিজেই নিষিদ্ধ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই ভিডিও চরিত্রহনন, বিদ্বেষ বা অপপ্রচারের হাতিয়ার হয়।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক এআই ভিডিও এই সীমা অতিক্রম করছে। প্রচারণার নামে আক্রমণাত্মক বার্তা ছড়ানো হচ্ছে, যা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে। কিন্তু কন্টেন্টের পরিমাণ এত বেশি যে সবকিছু নজরদারিতে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এআই কন্টেন্ট নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে দোষারোপ করছে। একদিকে অভিযোগ উঠছে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার, অন্যদিকে উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গ। দুই পক্ষই বলছে, তারা নিজেরা এসব ভিডিও তৈরি করেনি। বরং প্রতিপক্ষ বা সমর্থকগোষ্ঠী এসব ছড়াচ্ছে।
এই দোষারোপের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ আরও বিভ্রান্ত হচ্ছে। কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা, এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় একটি এআই-ভিত্তিক স্ক্যানিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এই প্ল্যাটফর্ম আচরণবিধির আলোকে অনলাইন কন্টেন্ট পর্যবেক্ষণ করে। যেসব কন্টেন্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে জানানো হয়।
তবে কমিশন নিজেই স্বীকার করেছে, তাদের সক্ষমতা সীমিত। সব কন্টেন্ট যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই গুরুতর কেসগুলোতেই মূলত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতা থেকেই প্রশ্ন উঠছে, এই সীমিত নিয়ন্ত্রণ কি যথেষ্ট?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই কন্টেন্টের ক্ষেত্রে লেবেলিং খুব জরুরি। অর্থাৎ ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি—এই তথ্য স্পষ্টভাবে জানানো দরকার। এতে সাধারণ মানুষ অন্তত বুঝতে পারবে, তারা যা দেখছে তা শতভাগ বাস্তব নাও হতে পারে।
একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। মানুষ যদি জানে, এআই দিয়ে কীভাবে ভিডিও বানানো হয়, তাহলে সহজে বিভ্রান্ত হবে না। ঠিক যেমন ভুয়া কল এলে আমরা এখন একটু সাবধান হই, তেমনি ডিজিটাল কন্টেন্ট দেখেও সাবধান হওয়া শিখতে হবে।
এআই কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আরেকটি বড় ঝুঁকি আছে। সেটা হলো, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে যেন সাধারণ সমালোচনা বা ভিন্নমত চাপা না পড়ে। ক্ষতিকর কন্টেন্ট অবশ্যই থামাতে হবে। কিন্তু কোনটা ক্ষতিকর আর কোনটা বৈধ মতপ্রকাশ—এই পার্থক্য করতে দক্ষতা দরকার।
এই জায়গাতেই নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তি যেমন দ্রুত বদলাচ্ছে, তেমনি বদলাতে হবে নজরদারির কৌশলও।
এআই প্রযুক্তি নির্বাচনী প্রচারণার বাস্তবতা হয়ে গেছে। এটাকে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং দরকার সঠিক নীতিমালা, কার্যকর প্রয়োগ আর জনসচেতনতা। স্বচ্ছ লেবেলিং, দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং আর শক্তিশালী ডিজিটাল শিক্ষা, এই তিনটি মিললেই এআইয়ের ইতিবাচক দিক কাজে লাগানো সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন মানে মানুষের ভোট, মানুষের সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত যেন বিভ্রান্তিতে নয়, সত্য তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, এই দায়িত্ব সবার। প্রযুক্তি তখনই উপকারী হবে, যখন তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, দুর্বল নয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।

