দেশজুড়ে শীতের দাপট দিন দিন আরও বাড়ছে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় ইতোমধ্যেই বিপর্যস্ত জনজীবন। আবহাওয়াবিদদের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, এই শৈত্যপ্রবাহ এখনো শেষ হয়নি। বরং আগামী কয়েক দিনে এটি আরও তীব্র রূপ নিতে পারে। বৃহস্পতিবার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা চলতি শীত মৌসুমে অন্যতম সর্বনিম্ন হতে পারে।
ইউরোপীয় স্যাটেলাইট ডেটায় ভয়াবহ শীতের ইঙ্গিত
বুধবার (৭ জানুয়ারি) কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সতর্কবার্তা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ আগামী কয়েক দিন আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। এর ফলে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং দিনের বেলাতেও শীতের অনুভূতি কাটছে না।
বৃহস্পতিবার থেকেই বাড়বে শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা
আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ জানান, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকাল থেকেই শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে ভোর ও সকালবেলায় কনকনে ঠান্ডা পড়বে।
সকাল ৬টার দিকে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম, যা শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শনিবার ও রোববার আরও ভয়াবহ ঠান্ডার আশঙ্কা
শুধু বৃহস্পতিবারেই নয়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সপ্তাহের শেষ দিকে শীত আরও বাড়তে পারে। মোস্তফা কামাল পলাশের পোস্ট অনুযায়ী, আগামী শনিবার (১০ জানুয়ারি) ও রোববার (১১ জানুয়ারি) শৈত্যপ্রবাহ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
এই সময় রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ঘন কুয়াশার কারণে সকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা নাও মিলতে পারে, ফলে শীতের অনুভূতি আরও বাড়বে।
বুধবারের তাপমাত্রা ছিল ইতোমধ্যেই বেশ কম
শীত যে ইতোমধ্যেই চরমে পৌঁছেছে, তার প্রমাণ মিলেছে বুধবার সকালের তাপমাত্রা রেকর্ডে। বুধবার সকাল ৬টায় রাজশাহী জেলায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এছাড়া চুয়াডাঙ্গা ও গোপালগঞ্জে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যশোরে তাপমাত্রা নেমে আসে ৭ দশমিক ৪ ডিগ্রিতে। পঞ্চগড়ে রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, দেশের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়েছে।
৮ বিভাগের মধ্যে ৫টিতে শৈত্যপ্রবাহ
আবহাওয়াবিদ পলাশ আরও জানান, বুধবার সকাল ৬টার মধ্যে দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে অন্তত ৫টি বিভাগের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের পাশাপাশি মধ্যাঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ভারতের শীতল বায়ুপ্রবাহ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এই শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।
শীতের প্রভাবে বিপর্যস্ত জনজীবন
তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক এবং ছিন্নমূল মানুষদের জন্য এই শীত কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় সকালবেলা কাজে বের হতে পারছেন না শ্রমজীবীরা।
গ্রামাঞ্চলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালে ঠান্ডা লাগা, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরের রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।
কৃষি ও ফসলের ওপর শীতের প্রভাব
শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব কৃষিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদরা। অতিরিক্ত ঠান্ডায় বোরো ধান, শাকসবজি ও শীতকালীন ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভোরের কুয়াশা ও শিশির ফসলের পাতায় জমে রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ কারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
করণীয় ও সতর্কতা
এমন পরিস্থিতিতে আবহাওয়াবিদরা সবাইকে বাড়তি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঠান্ডা থেকে রক্ষা করা জরুরি। ভোর ও রাতের দিকে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়াই ভালো।
শীতবস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি ছিন্নমূল মানুষদের জন্য সামাজিক ও সরকারি সহায়তা বাড়ানোর কথাও বলছেন সচেতন মহল।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই শৈত্যপ্রবাহ এখনো তার চূড়ান্ত রূপ দেখায়নি। বরং সামনের কয়েক দিন আরও কঠিন হতে পারে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রির নিচে নামার আশঙ্কা শীতের ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ অবস্থায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়াই হতে পারে শীত মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

