অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরে আসা নতুন কিছু নয়। কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই যদি এমন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, যে ভাষা নিজেই ঠিকমতো জানেন না—তাহলে ব্যাপারটা যে চমকে দেওয়ার মতো, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক এমনই এক অদ্ভুত ও রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরে এক ৩৩ বছরের যুবক অনর্গল স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, যা দেখে সবাই রীতিমতো অবাক।
অপারেশন, অজ্ঞান করা আর তারপর অদ্ভুত ঘটনা
বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে অপারেশন করতেই হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীকে অজ্ঞান করে অস্ত্রোপচার করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর ওষুধের প্রভাব কমলে রোগীর জ্ঞান ফিরে আসে। এই ঘটনাতেও শুরুটা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল।
অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। কিছুক্ষণ পর রোগীর জ্ঞান ফিরতে শুরু করে। কিন্তু জ্ঞান ফিরতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আশপাশে থাকা নার্সরা লক্ষ্য করেন, রোগী ইংরেজি নয়, স্প্যানিশ ভাষায় অনর্গল কথা বলছেন।
সাবলীল স্প্যানিশে কথা, অথচ ভাষাটাই প্রায় অজানা
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই যুবক স্প্যানিশ ভাষা জানেনই না বললেই চলে। স্কুলজীবনে সামান্য স্প্যানিশ শিখেছিলেন। তাঁর ভাষাজ্ঞান বলতে কয়েকটি সাধারণ শব্দ আর ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গোনা—এইটুকুই। দৈনন্দিন জীবনে তিনি কখনোই স্প্যানিশে কথা বলেন না।
কিন্তু অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরতেই তিনি এমন সাবলীলভাবে স্প্যানিশ বলতে শুরু করেন, যেন সেটাই তাঁর মাতৃভাষা। বাক্য গঠন, উচ্চারণ—সবই ছিল একেবারে স্বচ্ছ ও নির্ভুল। এমনকি যাঁরা স্প্যানিশ ভাষায় অভ্যস্ত, তাঁরাও অবাক হয়ে যান।
চিকিৎসকরাও বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে সম্ভব
এই অদ্ভুত ঘটনা দেখে চিকিৎসকরাও প্রথমে হতবাক হয়ে যান। কীভাবে এমন একজন মানুষ, যিনি স্প্যানিশ ভাষা প্রায় জানেনই না, তিনি হঠাৎ এত সাবলীলভাবে সেই ভাষায় কথা বলতে পারেন—তার কোনও সরাসরি ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের এক জটিল ও রহস্যময় ক্ষমতার উদাহরণ। মানুষের মস্তিষ্কে এমন অনেক স্মৃতি ও তথ্য জমা থাকে, যা সচেতন অবস্থায় আমরা ব্যবহার করি না বা বুঝতেই পারি না যে সেগুলো আমাদের ভেতরে আছে।
মস্তিষ্কের ‘লুকানো ভাণ্ডার’ খুলে গিয়েছিল?
চিকিৎসকদের ধারণা, এই যুবকের মস্তিষ্কে স্কুলজীবনে শেখা স্প্যানিশ ভাষার স্মৃতিগুলো কোথাও গভীরে জমা ছিল। অপারেশনের সময় অজ্ঞান অবস্থায় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে বদলে যায়। জ্ঞান ফেরার সময় সেই লুকিয়ে থাকা স্মৃতিগুলো হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সহজ করে বললে, মাথার ভেতরের একটা পুরনো ফাইল যেন হঠাৎ খুলে গিয়েছিল। যেটা তিনি নিজেও জানতেন না যে এতদিন সেখানে ছিল।
এটাই প্রথম নয়, আগেও ঘটেছিল একই ঘটনা
এই ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তোলে আরেকটি তথ্য। ১৯ বছর বয়সে ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে গুরুতর চোট পান ওই যুবক। তখনও তাঁর একটি অপারেশন করতে হয়েছিল। সেই অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরতেই তিনি প্রায় ২০ মিনিট ধরে টানা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেছিলেন।
সেই সময়ও চিকিৎসকরা বিষয়টি লক্ষ্য করেছিলেন, তবে তখন সেটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এবার একই ঘটনা আবার ঘটায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মাতৃভাষা ইংরেজি, তবু স্প্যানিশে স্বচ্ছন্দ
এই যুবক আমেরিকার ইউটা অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটির বাসিন্দা। তাঁর মাতৃভাষা ইংরেজি। দৈনন্দিন জীবন, কাজকর্ম—সবকিছুতেই তিনি ইংরেজিতেই সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। স্প্যানিশ তাঁর জীবনে কখনোই ব্যবহার্য ভাষা ছিল না।
তবুও অপারেশনের পর জ্ঞান ফেরার মুহূর্তে বারবার স্প্যানিশ ভাষাই তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে, যা চিকিৎসকদের কাছে একেবারেই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
বিরল এই ঘটনাকে কী বলা হচ্ছে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনাকে অনেক সময় “ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ সিনড্রোম” বা মস্তিষ্কজনিত ভাষাগত বিভ্রান্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। যদিও এই ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোপুরি সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে কিনা, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক এখনো অনেকটাই অজানা। এই ধরনের ঘটনা সেই অজানাকেই সামনে নিয়ে আসে।
মানুষের মস্তিষ্ক এখনো রহস্যে ভরা
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, মানুষের মস্তিষ্ক কতটা বিস্ময়কর। আমরা যা জানি, তার বাইরেও আমাদের ভেতরে জমা থাকে অসংখ্য স্মৃতি ও দক্ষতা। কখন, কীভাবে সেগুলো প্রকাশ পাবে—তা আমরা নিজেরাও জানি না।
অপারেশনের পর অজানা ভাষায় অনর্গল কথা বলা এই যুবকের ঘটনা শুধু চিকিৎসকদের নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও এক গভীর কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা।

