শান্তিতে বাইরে বসার দিন যেন আর নেই। একটু দাঁড়ালেই বা বসতেই কুট করে এসে কামড়। রক্ত শুষে নেয় মশা। স্প্রে, কয়েল, ধূপ—কিছুই যেন পুরো কাজ করছে না। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, মশারা কেন এত বেশি মানুষকেই নিশানা করছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কারণ। আর সেই কারণের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ নিজেই।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মশাদের মানুষের রক্তের প্রতি এই বাড়তি লোভ কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। প্রকৃতি বদলেছে, জঙ্গল কমেছে, আর তার জেরেই বদলেছে মশার খাদ্যাভ্যাস।
এই গবেষণাটি হয়েছে ব্রাজ়িলের বিখ্যাত আটলান্টিক অরণ্যে। এই অরণ্য শুধু ব্রাজ়িলেই নয়, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত। একসময় জীববৈচিত্রে ভরা এই অরণ্যে হাজার হাজার উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাস ছিল। কিন্তু মানুষের লাগাতার আগ্রাসনে আজ সেই জঙ্গলের আয়তন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে।
এই পরিবেশেই গবেষণা চালান ব্রাজ়িলের ফেডেরাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অলওয়াল্ডো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। লক্ষ্য ছিল একটাই—মশারা আসলে কার রক্ত বেশি খাচ্ছে, আর কেন।
গবেষণায় মোট ১,৭১৪টি মশা পরীক্ষা করা হয়। এই মশাগুলি ছিল ৫২টি ভিন্ন প্রজাতির। এর মধ্যে ১৪৫টি ছিল স্ত্রী মশা, কারণ একমাত্র স্ত্রী মশাই রক্ত শোষণ করে।
এই ১৪৫টি স্ত্রী মশার মধ্যে ২৪টির পেটে থাকা রক্ত পরীক্ষা করা হয়। সেখান থেকেই আসে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য। দেখা যায়, এই ২৪টির মধ্যে ১৮টি মশার পেটেই রয়েছে মানুষের রক্ত।
বাকি মশাগুলির পেটে পাওয়া গেছে ইঁদুর, পাখি, উভচর প্রাণী, এমনকি কুকুরজাতীয় প্রাণীর রক্ত। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে মানুষই ছিল সবচেয়ে এগিয়ে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এর মূল কারণ জঙ্গল ধ্বংস। একসময় মশারা বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করত। তাদের সামনে ছিল নানা বিকল্প। আজ সেই বিকল্প অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
মানুষ জঙ্গল কেটে বসতি গড়েছে। বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে, বাকিদের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে মশাদের স্বাভাবিক খাদ্যের উৎসে টান পড়েছে। বাধ্য হয়েই তারা মানুষের দিকে ঝুঁকছে।
সহজ করে বললে, যেখানে মানুষ বেশি, সেখানেই এখন খাবার খুঁজছে মশা। গবেষক সার্জিয়ো মাচাদো মানুষের এই অবস্থানকে বলেছেন ‘প্রিভ্যালেন্ট হোস্ট’। মানে, সহজলভ্য এবং সর্বত্র উপস্থিত খাদ্য উৎস।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে—আটলান্টিক অরণ্যে তো এখনও জীববৈচিত্র কম নয়, তা হলে শুধু মানুষ কেন? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা খুব সোজা। মানুষ এখন জঙ্গলের ভেতরেই বেশি যাতায়াত করছে। রাস্তা, গ্রাম, শহর—সব ঢুকে পড়েছে অরণ্যের গায়ে।
ফলে মশাদের জন্য মানুষ সবচেয়ে সহজ টার্গেট। পশুপাখির তুলনায় মানুষ ধরা সহজ, আর আশপাশেই মেলে। তাই বেছে বেছে মানুষকেই নিশানা করছে মশারা।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা। মশারা যখন একের পর এক মানুষকে কামড়ায়, তখন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ এইভাবেই দ্রুত ছড়াতে পারে। কোনও সংক্রমিত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশা যখন সুস্থ কাউকে কামড়ায়, তখন রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, মানুষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া মশারা ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতির জন্য বিজ্ঞানীরা সরাসরি মানুষকেই দায়ী করছেন। জঙ্গল কাটা হয়েছে মানুষের হাতে। প্রাণীর বাসস্থান নষ্ট হয়েছে মানুষের কারণে। মশাদের থাকার জায়গা ও খাবারের উৎস সংকুচিত হয়েছে মানুষের জন্যই।
বেঁচে থাকার তাগিদে মশারা বদলে ফেলেছে তাদের খাদ্যাভ্যাস। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফল ভোগ করতে হচ্ছে মানুষকেই।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই গবেষণা কাজে লাগালে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোথায় মানুষ আর মশার সংস্পর্শ বেশি, সেটা বোঝা যাবে। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য ফেরানো জরুরি। জঙ্গল রক্ষা, জীববৈচিত্র বাঁচানো আর সচেতন জীবনযাপনই হতে পারে মশার উপদ্রব কমানোর আসল চাবিকাঠি।
শেষ পর্যন্ত কথাটা খুব সোজা—মশা বদলায়নি, বদলেছে আমরা। আর তার ফল এখন আমাদের শরীরেই এসে কামড় বসাচ্ছে।

