চুপিসারে শরীরে ঢুকে পড়ে। বছরের পর বছর লুকিয়ে থাকতে পারে। ধরা পড়ে না সহজে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মারাত্মক ক্ষতি করে। এমনই এক ভয়ংকর পরজীবী নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই পরজীবীর সংক্রমণ পরিচিত “স্নেইল ফিভার” নামে, যার বৈজ্ঞানিক নাম স্কিস্টোসোমিয়াসিস। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই রোগ এখন আর শুধু নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। এর ধরন বদলাচ্ছে, শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
কী এই স্নেইল ফিভার, আর কেন নামটা এমন
স্নেইল ফিভারের নাম শুনে অনেকেই ভাবেন, বুঝি শামুক কামড়ালে হয়। আসলে বিষয়টা একটু আলাদা। বিশেষ ধরনের কিছু শামুক এই পরজীবী বহন করে। শামুক যেসব মিঠা পানিতে থাকে, সেই পানিতে পরজীবীর লার্ভা ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ বা প্রাণী যদি সেই পানিতে নামেন, গোসল করেন বা কাজ করেন, তখনই বিপদ।
এই লার্ভাগুলো ত্বক গলিয়ে ফেলার মতো শক্তিশালী এনজাইম ছাড়ে। ফলে কোনো কাটা-ছেঁড়া ছাড়াই ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়ে। মানুষ টেরও পায় না।
শরীরে ঢোকার পর কী করে এই পরজীবী
শরীরে ঢোকার পর পরজীবীগুলো রক্তনালিতে গিয়ে বসবাস শুরু করে। ধীরে ধীরে এগুলো পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয়। স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ে। কিছু ডিম মল বা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। কিন্তু অনেক ডিম শরীরের ভেতরেই আটকে থাকে।
এই ডিমগুলো জমা হয় লিভার, ফুসফুস, তলপেট এবং যৌনাঙ্গের আশপাশে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন এই ডিম ধ্বংস করতে যায়, তখন আশপাশের সুস্থ টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখান থেকেই শুরু হয় বড় সমস্যা।
ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস: নীরব কিন্তু ভয়ংকর
যখন ডিমগুলো যৌনাঙ্গ ও মূত্রনালির আশপাশে আটকে যায়, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় ইউরোজেনিটাল স্কিস্টোসোমিয়াসিস। এতে পেটব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যু ঝুঁকিও থাকে।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, অনেক মানুষ বছরের পর বছর এই রোগ নিয়ে বেঁচে থাকেন, অথচ বুঝতেই পারেন না।
কত মানুষ আক্রান্ত, আর কোথায় বেশি
প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এই রোগের চিকিৎসা নেন। তাদের বড় অংশই আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা। কারণ, যেসব শামুক এই পরজীবী বহন করে, সেগুলো আফ্রিকায় বেশি পাওয়া যায়।
তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অন্তত ৭৮টি দেশে এই রোগের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে চীন, ভেনেজুয়েলা, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এটি এখন আর আঞ্চলিক সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ।
পরজীবী বদলে যাচ্ছে, বাড়ছে ঝুঁকি
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই পরজীবীর গঠন ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, মানুষ ও প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবীগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন “হাইব্রিড” ধরন তৈরি করছে।
এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষ ও প্রাণী—দুজনকেই আক্রান্ত করতে পারে। ফলে রোগের চক্র ভাঙা আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
মালাউইতে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংগ্রহ করা পরজীবীর প্রায় সাত শতাংশই ছিল এমন হাইব্রিড ধরন। গবেষকদের ধারণার চেয়েও এই সংখ্যা বেশি।
অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া বলেন, এটি হয়তো সমস্যার সামান্য অংশ মাত্র। অনেক ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণ পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না।
পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না যৌনাঙ্গের সংক্রমণ
আরও ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। এই হাইব্রিড পরজীবীগুলো মানুষের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এদের ডিম সাধারণ পরজীবীর ডিমের মতো দেখতে নয়। ফলে মাইক্রোস্কোপে সহজে ধরা পড়ে না।
অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা এই উপসর্গগুলোকে যৌনবাহিত রোগ ভেবে ভুল করেন। ফলে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পান না।
চিকিৎসা না হলে যৌনাঙ্গে ক্ষত, বন্ধ্যত্ব এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিক চাপও অনেক বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তন আর ভ্রমণ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন এলাকায় শামুক ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ভ্রমণ ও মানুষের অভিবাসনের ফলে এই রোগও এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ইউরোপের কিছু এলাকায় হাইব্রিড স্নেইল ফিভারের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। যা আগে কল্পনাও করা হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি বৈশ্বিক উদ্বেগ।”
চিকিৎসা আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
স্নেইল ফিভার সাধারণত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধে সেরে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের—যেমন শিশু, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের—প্রতি বছর এই ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে।
বড় পরিসরে ওষুধ বিতরণের ফলে ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য।
তবে সমস্যা হলো, নতুন হাইব্রিড পরজীবীগুলো হয়তো প্রচলিত চিকিৎসায় পুরোপুরি কাজ নাও করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, এসব রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর হবে।
অর্থায়ন কমছে, ঝুঁকি বাড়ছে
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো অর্থায়ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উপেক্ষিত ট্রপিক্যাল রোগ খাতে সহায়তা ৪১ শতাংশ কমে গেছে।
অথচ এই সময়েই নতুন নতুন ঝুঁকি সামনে আসছে। অর্থায়ন না বাড়লে এতদিনের অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শেষ কথা
স্নেইল ফিভার কোনো নতুন রোগ নয়। কিন্তু এর রূপ বদলাচ্ছে। হাইব্রিড পরজীবী, জলবায়ু পরিবর্তন, শনাক্তকরণের জটিলতা—সব মিলিয়ে এটি এখন আরও ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক মুসায়া স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমরা রোগটি নির্মূল করতে পারি। কিন্তু এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।”
এই সতর্কবার্তা শুধু বিজ্ঞানীদের নয়। এটি নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আমাদের সবার জন্য। কারণ এই নীরব পরজীবী সীমান্ত মানে না। আজ দূরে, কাল খুব কাছেই চলে আসতে পারে।

