Homeইতিহাস-ঐতিহ্যকেশব দারগার বাড়ি: যশোরের শতবর্ষী ইতিহাসের সাক্ষী

কেশব দারগার বাড়ি: যশোরের শতবর্ষী ইতিহাসের সাক্ষী

নতুন প্রজন্মও যখন এখানে আসে, তখন তারা শুধু একটি বাড়ি দেখছে না; দেখছে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমাহার।

Share

যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো কেশব দারগার বাড়ি। সদর উপজেলা থেকে ৩৩ কিলোমিটার পূর্বে এবং অভয়নগর উপজেলা থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে, চলিশিয়া ইউনিয়নের পাঁচশ’ মিটার পূর্বে ও নওয়াপাড়া-চুকনগর সড়কের পূর্বপাশে তিনশ’ মিটার এগোলেই চোখে পড়ে এই প্রাচীন স্থাপনা। স্থানীয়রা আজও এটি ‘কেশব দারগার বাড়ি’ নামে চেনে। পথচারী বা নতুন দর্শনার্থীর চোখে এই বাড়িটি প্রথম দেখাতেই জাগায় বিস্ময়—যেমন মনে হয় ইট-পাথরের ভেতর লুকিয়ে আছে শতবর্ষের গল্প।

বাড়ির ইতিহাস ও সময়চিহ্ন

ভবনের মূল প্রবেশদ্বারের অর্ধগোলাকার বৃত্তে খোদাই করা রয়েছে ‘১৩৩০ বঙ্গাব্দ’। অনেকেই এটিকে নির্মাণ সন মনে করেন, কিন্তু স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা এটি মূলত ক্রয় সূত্রে মালিকানা লাভের সন। তাঁদের মতে, ভবনটি নির্মিত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। অর্থাৎ, শতাধিক বছর ধরে এই বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

একতলা এই ভবনটি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত। পার্শ্ববর্তী সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১.৩ মিটার উঁচু একটি প্লাটফর্মের ওপর এটি স্থাপন করা হয়েছে। ভবনটি দক্ষিণমুখী এবং সামনে ছয় ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা মেলে অর্ধবৃত্তাকার খিলান সমৃদ্ধ প্রবেশদ্বার, যা বাড়িটিকে এক আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। দক্ষিণ ও উত্তর—দুই পাশেই প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে, যেন বাতাস ও আলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার জন্যই এই নকশা করা হয়েছিল।

ভেতরে রয়েছে পাঁচটি বড় কক্ষ। এক সময় কাঠের বর্গা ও বিম ব্যবহার করে নির্মিত খিলান ছাদ ছিল যা স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। বর্তমানে সময়ের প্রয়োজনে সেই ছাদ অপসারণ করে টিনের ছাদ বসানো হয়েছে, তবুও দেয়ালের ভেতরে ভেতরে আজও দেখা যায় ফুল-লতাপাতার নকশা, যা ঘরের নিঃশব্দ দেয়ালকে জীবন্ত আবেশ দেয়।

নির্মাণ উপকরণ ও নকশা

বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত ইটের মাপেও রয়েছে বৈচিত্র্য—২১×১০×৬, ২৪×১২×৬ এবং ১৮×১২×৫ সেন্টিমিটার। দরজা ও জানালায় লোহার ব্যবহার, জানালার ওপর বামন ডোয়ার্ফ নকশা এবং প্রবেশপথের জোড়া প্লাস্টার অলংকরণ—সব মিলিয়ে স্থাপনাটি যেন শিল্পীসত্তার নিঃশব্দ প্রকাশ। প্রায় সাত মিটার উচ্চতার এই ভবন আজও বসবাসের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক জীবনের প্রয়োজন মেটাতে সিমেন্ট-বালুর পলেস্তারা দেওয়া হয়েছে, কিছু পরিবর্তন এসেছে ছাদ ও কাঠামোয়। তবুও মূল রূপের ভেতর লুকিয়ে আছে এক শতাব্দীর ঐতিহ্য, যা স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।

ঐতিহাসিক তথ্য ও খতিয়ান

এসএ খতিয়ানে ভূমি মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বিল্লাল মল্লিক গং-এর নাম ও দাগ নম্বর ১১৯০। এই তথ্য বাড়িটির ঐতিহাসিক পরিচয়কে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। ওমর আলী মল্লিকের বাড়ি বা কেশব দারগার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি এক সময়ের দলিল, একটি অঞ্চলের স্মৃতি এবং ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের নীরব সংলাপ।

সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

প্রতিদিন মানুষের বসবাস, হাঁটাচলা ও জীবনযাপনের ভেতর দিয়েই এই বাড়িটি বহন করছে তার শতবর্ষী গল্প। নতুন প্রজন্মও যখন এখানে আসে, তখন তারা শুধু একটি বাড়ি দেখছে না; দেখছে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমাহার। কেশব দারগার বাড়ি তাই শুধুমাত্র পুরনো ভবন নয়—এটি সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের নিদর্শন।

লেখক: সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক সাজেদ বকুল।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন