Homeইতিহাস-ঐতিহ্যসুরমা ও কাজলের হাজার বছরের ইতিহাস: সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আত্মিক সংযোগের অনন্য...

সুরমা ও কাজলের হাজার বছরের ইতিহাস: সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আত্মিক সংযোগের অনন্য গল্প

একফোঁটা কালো রেখার ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের স্মৃতি। তাই কাজল কখনোই শুধু মেকআপ নয়। এটা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে চোখের পাতায় আঁকা এক গভীর সংযোগ।

Share

চোখে একফোঁটা কালো রেখা। দেখতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির ছাপ। সুরমা বা কাজল শুধু সাজগোজের জিনিস নয়। এটি মানুষের স্মৃতি, শিকড় আর পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে কাজল মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব ভাষা।

কাজল কীভাবে হয়ে উঠল বিশ্বসংস্কৃতির অংশ

কাজলের ব্যবহার কোনো এক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ—সব জায়গাতেই এর আলাদা আলাদা নাম আর রূপ আছে। আরব বিশ্বে একে বলা হয় কুহল। দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা বলি কাজল বা সুরমা। ইরানে নাম সোরমে, নাইজেরিয়ায় তিরো। ইংরেজিতে কোল বা আইলাইনার।

এই বৈচিত্র্যই বলে দেয়, কাজল আসলে বিশ্বমানবের এক যৌথ ঐতিহ্য।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও কাজলের মর্যাদা

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো আরব অঞ্চলের কাজলকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি খুব বড় একটা বার্তা দেয়। কাজল কোনো সাময়িক ফ্যাশন নয়। এটি একটি জীবন্ত সংস্কৃতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে।

ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির ফলে কাজল তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহার আর এর সঙ্গে জড়িত লোকজ জ্ঞান সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রাচীন সভ্যতায় কাজলের শেকড়

কাজলের ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় হাজার হাজার বছর পেছনে। প্রাচীন মিশর, মেসোপটেমিয়া আর পারস্য সভ্যতায় কাজলের ব্যবহার ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। সেখানে নারী-পুরুষ সবাই কাজল পরত।

প্রাচীন মিশরে কাজল ছিল শুধু সাজের জন্য নয়। মানুষ বিশ্বাস করত, এটি চোখকে রোগ থেকে বাঁচায়। এমনকি বদনজর থেকেও রক্ষা করে। তাই তারা কবরের ভেতরও কাজলের পাত্র রাখত, যেন পরকালেও এটি সঙ্গে থাকে।

ভাবুন তো, কেউ যদি মৃত্যুর পরও কোনো জিনিস সঙ্গে নিতে চায়, তাহলে সেটার গুরুত্ব কতটা গভীর হলে এমন হয়।

রানী নেফারতিতি ও আইলাইনারের জনপ্রিয়তা

আইলাইনারকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে আলোচিত নাম রানী নেফারতিতি। তার চোখের গাঢ় কালো কাজল আজও সৌন্দর্যের প্রতীক। ১৯১২ সালে তার আবক্ষ মূর্তি আবিষ্কারের পর ইউরোপজুড়ে এই মেকআপ স্টাইল ছড়িয়ে পড়ে।

জার্মানির নারীরা নেফারতিতির চোখের সাজ অনুকরণ করতে শুরু করেন। তখন কাজল হয়ে ওঠে ক্ষমতা, সৌন্দর্য আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। আজও ইউটিউব আর টিকটকে নেফারতিতি লুকের শত শত ভিডিও দেখা যায়।

নারী, প্রবাস ও কাজলের আবেগ

ব্রিটিশ-লেবানিজ লেখক ও সাংবাদিক জাহরা হানকিরের কাছে কাজল মানে শুধু মেকআপ নয়। তার পরিবার লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে চলে যায়। বিদেশে বড় হতে হতে তিনি দেখেছেন, তার মা কাজল পরার সময় যেন নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

আজও তিনি যখন আইলাইনার পরেন, তখন তার মনে হয় তিনি তার মা, দাদী আর মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য নারীর সঙ্গে অদৃশ্য এক বন্ধনে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এই অনুভূতিই কাজলকে সাধারণ প্রসাধনী থেকে আলাদা করে।

কাজল ও আত্মিক বিশ্বাস

অনেক সংস্কৃতিতে কাজলকে সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সূর্যের তাপ, ধুলাবালি কিংবা খারাপ দৃষ্টি থেকে বাঁচার বিশ্বাস রয়েছে বহু জায়গায়। তাই শিশুদের চোখেও কাজল লাগানো হয়।

বাংলাদেশে একসময় ছোট শিশুদের চোখে বা কপালে কাজল দেওয়ার চল ছিল। এখনো অনেক পরিবারে এই রীতি টিকে আছে। এটা শুধু সাজ নয়, বরং ভালোবাসা আর সুরক্ষার প্রকাশ।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কাজলের ভিন্ন অর্থ

জাপানে গেইশা নারীরা লাল আইলাইনার ব্যবহার করেন। এটি তাদের কাছে সুরক্ষার প্রতীক। মেক্সিকান-আমেরিকান চোলা সংস্কৃতিতে আইলাইনার মানে পরিচয় আর প্রতিবাদের ভাষা।

আফ্রিকার চাদে ওয়াদাবি নামের যাযাবর জনগোষ্ঠীর পুরুষরা সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সেখানে পুরুষরাই কাজল পরে সাজেন। জর্ডানের বেদুইন পুরুষরাও কাজল পরেন। কখনো ধর্মীয় কারণে, কখনো সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে, আবার কখনো শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য।

এখানেই কাজলের আসল শক্তি। এটি লিঙ্গভেদ মানে না।

কাজল কি শুধু সাজগোজের জিনিস

আধুনিক সময়ে কাজলকে অনেকেই শুধু ফ্যাশনের অংশ ভাবেন। কিন্তু এর গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি এক ধরনের আচার। কাজল লাগানোর মুহূর্তটা অনেকের কাছে ধ্যানের মতো। তখন মানুষ নিজের ইতিহাস, পরিবার আর সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়।

জাহরা হানকিরের ভাষায়, কাজল লাগানো মানে শুধু চোখে দাগ টানা নয়। এটা অনেক বেশি কিছু। এটা আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের একটা পথ।

কাজলের ভবিষ্যৎ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ

আজকের বাণিজ্যিক সৌন্দর্য শিল্পে কাজল নানা রূপে পাওয়া যায়। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী কাজলের জায়গা আলাদা। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এই পুরোনো জ্ঞান আর কারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ দিয়েছে।

এটি বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলোর জন্যও এক ধরনের সম্মান। যারা ঔপনিবেশিকতা, বাস্তুচ্যুতি আর সাংস্কৃতিক চাপের মাঝেও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

শেষ কথা

কাজল বা সুরমা চোখের সৌন্দর্য বাড়ায়, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এটি মানুষের ইতিহাসের অংশ। এটি মা থেকে মেয়ের কাছে, দাদী থেকে নাতনির কাছে পৌঁছে যাওয়া এক নীরব গল্প।

একফোঁটা কালো রেখার ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের স্মৃতি। তাই কাজল কখনোই শুধু মেকআপ নয়। এটা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে চোখের পাতায় আঁকা এক গভীর সংযোগ।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন