Homeএক্সক্লুসিভজিভে জল আনা শিউলি গুড়ের স্বাদই আলাদা, কোথায় গেলে পাবেন খাঁটি শীতের...

জিভে জল আনা শিউলি গুড়ের স্বাদই আলাদা, কোথায় গেলে পাবেন খাঁটি শীতের গুড়

শিউলি গুড় শুধু একটা খাবার নয়, এটা শীতের আনন্দের একটা বড় অংশ। ভোরের কুয়াশা, খেজুর গাছ, রস নামানো, ধীরে ধীরে গুড় জ্বাল—সব মিলিয়ে একেবারে বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই স্বাদ।

Share

শীত এলেই বাঙালির মনে প্রথম যে জিনিসটা উঁকি দেয়, তা হলো গুড়। ঠান্ডা ভোরে কুয়াশা ভেজা বাতাস, আর তার মাঝেই খেজুর গাছ থেকে রস নামার দৃশ্য—এটা শুধু একটা কাজ নয়, একেবারে অনুভূতি। শীতকাল আর খেজুর গুড় যেন বাঙালির জীবনে হাতে হাত ধরে চলে। এই সময়ের গুড়ের স্বাদ বছরের আর কোনও সময়ে মেলে না। তার মধ্যেও শিউলি গুড়ের কথা আলাদা করে বলতেই হয়।

শীত মানেই গুড়, আর গুড় মানেই উৎসব

শীতের বাজারে পা রাখলেই বোঝা যায়, গুড়ের কত রকমফের। নলেন গুড়, নরম পাটালি, শক্ত পাটালি, দানা গুড়—নাম শুনতেই জিভে জল এসে যায়। এই গুড় দিয়েই তৈরি হয় পিঠেপুলি, পায়েস, নানান মিষ্টি। মকরসংক্রান্তির সময় তো প্রায় প্রতিটা বাঙালির বাড়ি গুড়ের মিষ্টি গন্ধে ভরে যায়।

একটা সাধারণ পিঠেও যদি খাঁটি গুড় থাকে, তার স্বাদ একেবারে অন্যরকম হয়। দোকানের চিনি দিয়ে বানানো মিষ্টি আর শীতের গুড় দিয়ে বানানো পিঠের তফাৎ একবার খেলে আর ভোলা যায় না।

শিউলি গুড় কী, কেন এত আলাদা

শিউলি গুড় আসলে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি খাঁটি গুড়। যারা এই কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই গাছি বা শিউলি নামে পরিচিত। তাঁরা ভোরবেলায় খেজুর গাছ কেটে রস নামান, তারপর সেই রস ধীরে ধীরে জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন গুড়।

এই গুড়ের স্বাদ এতটাই মোলায়েম আর সুগন্ধি যে আলাদা করে কিছু মেশানোর দরকারই পড়ে না। মুখে দিলেই একটা হালকা ক্যারামেলের মতো গন্ধ, আবার বেশি মিষ্টিও নয়। এই কারণেই শিউলি গুড় দিয়ে বানানো পায়েস বা পিঠে এত জনপ্রিয়।

কোন কোন জেলায় সবচেয়ে ভালো গুড় পাওয়া যায়

পশ্চিমবঙ্গে বহু জেলায় গুড় তৈরি হয়। তবে পরিমাণ আর মানের দিক থেকে কিছু জেলা একেবারে এগিয়ে।

নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা আর দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সবচেয়ে বেশি খেজুর গুড় তৈরি হয়। এই জেলাগুলির জলবায়ু আর খেজুর গাছের গুণগত মান গুড়ের স্বাদে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়াও বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া আর হুগলি জেলার কিছু এলাকায় এখনো ঘরোয়া পদ্ধতিতে শিউলি গুড় তৈরি হয়।

এই সব জায়গায় অনেক পরিবার নিজের বাড়ির খেজুর গাছের রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানান। বড় কারখানার মতো নয়, ছোট চুল্লিতে ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয় বলে স্বাদটা থাকে একেবারে আসল।

নলেন গুড় আর নরম পাটালির চাহিদা কেন বেশি

শীতের গুড়ের মধ্যে নলেন গুড় আর নরম পাটালির চাহিদা সবথেকে বেশি। নলেন গুড় সাধারণত একদম প্রথম দিকের রস দিয়ে তৈরি হয়। তাই এর রং হালকা, গন্ধ তীব্র আর স্বাদ খুব মিষ্টি।

নরম পাটালি আবার অনেকেই ‘পায়েস স্পেশাল’ বলে ডাকেন। কারণ এই গুড় দুধে দিলে দুধ কাটে না। পায়েস বানাতে গিয়ে এটা একটা বড় সুবিধা। অনেক গুড় প্রস্তুতকারকই দাবি করেন, তাঁদের বানানো খাঁটি নরম পাটালি ফুটন্ত দুধে দিলেও দুধ নষ্ট হয় না।

বাজারের গুড় আর ঘরোয়া গুড়ের তফাৎ

এখানেই একটা বড় সমস্যা হয়। অনেকেই শীতের তাড়নায় বাজার থেকে গুড় কিনে আনেন। কিন্তু সব গুড় খাঁটি হয় না। কোথাও চিনি মেশানো, কোথাও কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়, যাতে রং ভালো দেখায় বা বেশি দিন টেকে।

ফল কী হয়? পিঠে বা পায়েস বানাতে গিয়ে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। কখনো দুধ কেটে যায়, কখনো গুড়ের গন্ধটাই ঠিক থাকে না।

অন্যদিকে, শিউলি বা গাছিরা যখন নিজেরা বাড়িতে গুড় তৈরি করেন, তখন ভেজালের সুযোগ প্রায় থাকে না। তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি গুড় কিনলে অন্তত নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

কোথায় গেলে পাবেন খাঁটি শিউলি গুড়

খাঁটি শিউলি গুড় পেতে গেলে একটু খোঁজখবর দরকার। রাজ্যের বিভিন্ন মেলায় শীতকালে এই গুড় বিক্রি করতে আসেন গুড় শিল্পীরা। গ্রামের মেলা, হস্তশিল্প মেলা বা শীতকালীন খাদ্য মেলায় চোখ রাখলেই অনেক সময় এমন বিক্রেতার খোঁজ পাওয়া যায়।

একবার যদি কারও গুড় পছন্দ হয়ে যায়, অনেকেই প্রতিবছর সেই একই প্রস্তুতকারীর কাছ থেকেই গুড় কেনেন। ধীরে ধীরে একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়।

অনলাইনেও মিলছে খাঁটি গুড়

এখন সময় বদলেছে। অনেক গুড় প্রস্তুতকারকই অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নিচ্ছেন। ফোনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ করে বাড়িতে গুড় পৌঁছে দিচ্ছেন। শহরে থাকলে এটা একটা বড় সুবিধা।

তবে অনলাইনে কিনলেও চেষ্টা করবেন এমন বিক্রেতা বেছে নিতে, যাঁরা নিজেরা গুড় তৈরি করেন। এতে ভেজালের আশঙ্কা অনেকটাই কমে।

শীতের গুড় কেনার সময় কী খেয়াল রাখবেন

খাঁটি গুড় সাধারণত খুব চকচকে হয় না। রং একটু ম্যাট, গন্ধটা স্বাভাবিক আর মিষ্টিটা মুখে লেগে থাকে না। খুব বেশি উজ্জ্বল রং বা অস্বাভাবিক গন্ধ থাকলে সাবধান হওয়াই ভালো।

আর একটা সহজ পরীক্ষা হলো, সামান্য গুড় গরম দুধে দিয়ে দেখা। যদি দুধ কেটে যায়, তাহলে বুঝতে হবে গুড়ে সমস্যা আছে।

শেষ কথা

শিউলি গুড় শুধু একটা খাবার নয়, এটা শীতের আনন্দের একটা বড় অংশ। ভোরের কুয়াশা, খেজুর গাছ, রস নামানো, ধীরে ধীরে গুড় জ্বাল—সব মিলিয়ে একেবারে বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই স্বাদ।

এই শীতে যদি সত্যিই পিঠে-পায়েসের আসল স্বাদ পেতে চান, তাহলে একটু চেষ্টা করে খাঁটি শিউলি গুড় খুঁজে নিন। একবার খেলে বুঝবেন, কেন সবাই বলে—শিউলি গুড়ের স্বাদ সত্যিই আলাদা।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন