Homeঅর্থ-বানিজ্যঠান্ডার দাপটে মালদহে বিপর্যস্ত মধুচাষ, বাক্সবন্দি মৌমাছিতে উৎপাদন নিয়ে গভীর সংকট

ঠান্ডার দাপটে মালদহে বিপর্যস্ত মধুচাষ, বাক্সবন্দি মৌমাছিতে উৎপাদন নিয়ে গভীর সংকট

Share

মালদহ জেলায় শীত মানেই সরষে ফুলের হলুদে ভরে ওঠা মাঠ, বাতাসে ভেসে বেড়ানো ম ম করা গন্ধ আর ব্যস্ত মৌমাছির গুঞ্জন। কিন্তু এবছর সেই চেনা ছবি ভেঙে পড়েছে। প্রবল শৈতপ্রবাহ, ঘন কুয়াশা আর রোদের অভাবে কার্যত বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছে মৌমাছির দল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মধুচাষে। মাথায় হাত পড়েছে মৌ পালকদের। মধু উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে বড়সড় সংশয়।

এই শীতে সাধারণ মানুষ যেমন কাবু, তেমনই অসহায় হয়ে পড়েছে মৌমাছিরাও। কনকনে ঠান্ডায় ওদের স্বাভাবিক উড়ান বন্ধ। সরষে ফুলে বসে রেণু সংগ্রহ করার মতো শক্তি পাচ্ছে না ওরা। ভোরের ঘন কুয়াশা আর দিনের পর দিন রোদ না ওঠায় মৌমাছিরা বাক্স থেকে বেরোচ্ছে না। ফলে খাবার সংগ্রহ বন্ধ হয়ে গেছে। দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে গিয়ে অনেক মৌমাছির মৃত্যু হচ্ছে।

মৌমাছির এই অবস্থা শুধু প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মধু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। মৌমাছি না উড়লে মধু হয় না। এতটাই সহজ, আবার এতটাই ভয়ংকর বাস্তব।

ওল্ড মালদহের মাধাইপুর, হরিশ্চন্দ্রপুর, সাদিপুর, জগন্নাথপুর—সব জায়গাতেই একই ছবি। চারদিকে সরষে ফুলে ঢাকা মাঠ, কিন্তু সেই ফুলে বসার মতো মৌমাছি নেই। বেহুলা নদীর ধারে কিংবা আমবাগানের পাশে সারি সারি বাক্স রাখা, কিন্তু ভেতরে বন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি।

মৌ পালক জীবন রাজবংশী জানাচ্ছেন, এমন শীত তিনি অনেক বছরেও দেখেননি। মানুষের যেমন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, মৌমাছির অবস্থাও তেমন। খাবার সংগ্রহ করতে না পেরে মৌমাছির পেটে টান পড়েছে। অনেকগুলো তো অনাহারেই মারা যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখতে একমাত্র ভরসা চিনি। খোলা বাজার থেকে চিনি কিনে জল মিশিয়ে মৌমাছিকে খাওয়াতে হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় আরেক সমস্যা। প্রতিদিন একটি বাক্সে গড়ে ৫০০ গ্রাম চিনি দিতে হয়। যদি কারও ১০০টি বাক্স থাকে, তাহলে দিনে প্রায় ৫০ কেজি চিনি দরকার।

বর্তমান বাজারদরে এত চিনি কেনা মানে বড় অঙ্কের খরচ। মধু উৎপাদন ঠিকমতো না হলে সেই টাকা ওঠার সম্ভাবনাও নেই। ফলে চাষিরা পড়েছেন দোটানায়। মৌমাছিকে বাঁচাবেন, নাকি নিজেদের সর্বস্বান্ত হওয়া ঠেকাবেন—এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মাথায়।

হরিশ্চন্দ্রপুরের সাদিপুর গ্রামের মৌ পালক মোফিজুল হোসেন জানাচ্ছেন, একটি প্রতিপালন বাক্সে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি মৌচাক থাকে। প্রতিটি চাকেই থাকে ১০ হাজারের বেশি মৌমাছি। অর্থাৎ একটি বাক্সেই লক্ষাধিক মৌমাছি পালন করা হয়।

এই বিপুল সংখ্যক মৌমাছি যখন একসঙ্গে খাবার পায় না, তখন পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ঠান্ডায় ওরা জড়োসড়ো হয়ে থাকে। উড়তে পারে না। খাবার সংগ্রহ করতে না পারায় শুরু হয় মড়ক। একের পর এক মৌমাছির মৃত্যু চাষিদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জগন্নাথপুর এলাকার মৌ পালক আবদুল হামিদ বলছেন, মৌমাছিরা মূলত রোদ পেলেই বাক্স থেকে বের হয়। আকাশ ঝলমলে থাকলে তবেই ওরা সরষে ফুলে যায়। কিন্তু এবছর দিনের পর দিন রোদ উধাও। কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে ফুলের মুখ। ফলে মৌমাছিরা বাইরে আসছে না।

বাক্সের ভেতর বন্দি অবস্থায় খাবার শেষ হয়ে গেলে অনাহার অবশ্যম্ভাবী। তার ফলেই প্রচুর সংখ্যক মৌমাছি মারা যাচ্ছে। এই ক্ষতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।

মালদহের অনেক মৌ পালক আগেভাগেই বিভিন্ন পাইকার ও সংস্থার কাছ থেকে মধু বিক্রির জন্য টাকা নিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে বাক্স, যাতায়াত, শ্রমিকসহ নানা খরচ মেটানো হয়েছে। এখন যদি মধু উৎপাদন কমে যায়, তাহলে সেই অগ্রিম টাকা শোধ করাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

মুচিয়ারের মহাদেবপুর এলাকার পলাশ মণ্ডল বলছেন, চিনি কিনে মৌমাছিকে বাঁচাতে গেলেই লোকসান বাড়ছে। আবার চিনি না দিলে মৌমাছি মরছে। দুই দিক থেকেই চাপ।

মালদহ জেলা প্রতিবছর প্রায় আড়াই হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদন করে। এর বড় অংশ আসে ওল্ড মালদহ ও হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকা থেকে। এখানে বৈজ্ঞানিক এপিকালচার পদ্ধতিতে মধুচাষ হয়। সরষে খেতের ধারে বড় বড় বাক্স রেখে মৌমাছি পালন করা হয়, তারপর নির্দিষ্ট সময়ে মধু সংগ্রহ করা হয়।

উদ্যানপালন দফতরের উপ-অধিকর্তা সামন্ত লায়েক জানাচ্ছেন, এই ঠান্ডা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মধু উৎপাদনে বড় ঘাটতি দেখা দেবে। মৌমাছির স্বাভাবিক কার্যকলাপ ব্যাহত হলে উৎপাদন স্বাভাবিক থাকাই কঠিন।

মৌ পালকদের একটাই আশা—শীত একটু কমুক, রোদ উঠুক। আকাশ পরিষ্কার হলেই মৌমাছিরা আবার বাক্স ছেড়ে বেরোবে। সরষে ফুলে বসবে, রেণু সংগ্রহ করবে, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে মধু উৎপাদন।

কিন্তু ততদিন পর্যন্ত প্রতিটি দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। মালদহের মধুচাষ এখন প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ঠান্ডার এই দাপট কাটলেই হয়তো আবার গুঞ্জনে ভরে উঠবে সরষে ক্ষেত। না হলে এবছর মধু উৎপাদনে বড় ধাক্কা খাওয়া প্রায় নিশ্চিত।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন