Homeশিল্প ও সাহিত্যশৈশবের স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া আনন্দ: একটি টায়ার, একটি দৌড়, কিছু না-ভোলা...

শৈশবের স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া আনন্দ: একটি টায়ার, একটি দৌড়, কিছু না-ভোলা মুহূর্ত

জগহাটি বাওড়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা সেই শিশুটি আমাকে অন্তত এই কথাই মনে করিয়ে দিল—আনন্দ সব সময় বড় কিছুতে থাকে না। কখনো কখনো একটা পুরোনো টায়ারই যথেষ্ট।

Share

শৈশব কি সত্যিই ফিরে আসে না? হয়তো আসে না পুরোপুরি। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এমনভাবে এসে দাঁড়ায় চোখের সামনে, যেন এই তো একটু আগেই ছিল। একটা গন্ধে, একটা শব্দে, কিংবা একটুখানি দৃশ্যে। যশোর সদরের জগহাটি বাওড়ের পাশে দাঁড়িয়ে এমনই এক মুহূর্তের মুখোমুখি হলাম। একটি শিশু, হাতে একটি পুরোনো মটরসাইকেলের টায়ার। সে দৌড়াচ্ছে, হাসছে, নিজের মতো করে খেলছে। আর সেই দৃশ্য আমাকে টেনে নিয়ে গেল বহু বছর পেছনে, আমার নিজের শৈশবে।

এক সময় শৈশব মানে ছিল অল্পে খুশি হওয়া। দামি খেলনা নয়, নতুন গ্যাজেট নয়। একটা টায়ার, একটা কাঠি, কিংবা ভাঙা বলেই দিন কেটে যেত। আমরা সাইকেলের পুরোনো টায়ারে হাত চালিয়ে পুরো রাস্তা দৌড়ে বেড়াতাম। তখন সেটাই ছিল আমাদের পৃথিবী। কে কত দূর দৌড়াতে পারে, কে পড়ে না গিয়ে টায়ার চালাতে পারে, এসব নিয়েই ছিল প্রতিযোগিতা।

আজকের শিশুরা হয়তো সেই আনন্দটা কল্পনাও করতে পারে না। এখন শৈশব অনেকটাই বন্দি হয়ে গেছে স্ক্রিনের ভেতর। মোবাইল, ট্যাব, ভিডিও গেম—এসবেই আটকে আছে তাদের সময়। কিন্তু জগহাটি বাওড়ের পাশে দেখা সেই শিশুটি যেন অন্য এক সময় থেকে উঠে আসা চরিত্র।

জগহাটি বাওড় নিজেই এক শান্ত জায়গা। চারপাশে প্রকৃতি, বাতাসে জল আর মাটির গন্ধ। ঠিক সেই পরিবেশে শিশুটাকে দেখে মনে হলো, শৈশব এখনো পুরোপুরি হারায়নি। তার চোখে-মুখে যে উচ্ছ্বাস, যে প্রাণচাঞ্চল্য, তা একেবারে খাঁটি।

সে জানে না সোশ্যাল মিডিয়া কী। জানে না এই খেলাটা কতটা সাধারণ। তার কাছে এই টায়ারটাই সব। এই খেলাই তার সারা দিনের আনন্দ, সারা দিনের গল্প। আর সেই নিখাদ আনন্দই সবচেয়ে দামী।

দৃশ্যটা দেখে মনে হলো, শৈশব মরে গেলেও তার স্মৃতিগুলো এখনো ধুলো ধরেনি। ওই শিশুটার দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে আমিও যেন দৌড়াচ্ছিলাম। ফিরে যাচ্ছিলাম আমার ছোট্ট বেলায়। তখন স্কুল শেষে ব্যাগ ছুড়ে ফেলে বেরিয়ে পড়তাম খেলতে। মা ডাকতেন, তবু ফিরতে মন চাইত না।

আজ বড় হয়ে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। দায়িত্ব, ব্যস্ততা, প্রযুক্তি, আরাম। কিন্তু কোথাও যেন সেই সহজ আনন্দটা হারিয়ে গেছে। এখন হাসিও যেন হিসাব করে আসে। সময় করে আনন্দ করতে হয়। অথচ তখন আনন্দ নিজেই আমাদের খুঁজে নিত।

গ্রামবাংলার শৈশবের সঙ্গে প্রকৃতির একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। মাঠ, নদী, বাওড়, গাছপালা—সবই ছিল আমাদের খেলার সঙ্গী। জগহাটি বাওড়ের পাশের সেই শিশুটাকে দেখে মনে হলো, প্রকৃতি এখনো কাউকে কাউকে সেই পুরোনো আনন্দ ফিরিয়ে দেয়।

শহরের শিশুরা যেখানে কংক্রিটের দেয়ালে বন্দি, সেখানে এমন জায়গায় বেড়ে ওঠা শিশুরা এখনো খোলা আকাশের নিচে দৌড়াতে পারে। তাদের শৈশব এখনো একটু হলেও মুক্ত।

আমাদের অনেকের শৈশব এখন শুধু স্মৃতির অ্যালবামে। পুরোনো ছবি, ঝাপসা ভিডিও, কিংবা গল্পে গল্পে ফিরে আসে সেই সময়। সিনেমায় যখন কোনো শিশু টায়ার নিয়ে দৌড়ায়, তখন বুকের ভেতর হালকা একটা মোচড় দেয়। কারণ আমরা জানি, ওই আনন্দটা কতটা সত্যি।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো সেই শৈশব আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু তার স্মৃতি আমাদের মানুষ করে রেখেছে। জীবনের কঠিন সময়ে সেই স্মৃতিই দেয় একটু সাহস, একটু নরম অনুভূতি।

প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে অনেক সহজ আনন্দও কেড়ে নিয়েছে। আজ একটা শিশুকে খুশি করতে কত কিছু লাগে। অথচ এক সময় একটা টায়ারই ছিল যথেষ্ট।

জগহাটি বাওড়ের পাশে দেখা সেই দৃশ্য যেন প্রশ্ন করে গেল—আমরা কি সত্যিই এগিয়ে গেছি, নাকি কোথাও কিছু ফেলে এসেছি? হয়তো দুটোই।

এই লেখাটা শুধু নস্টালজিয়া নয়। এটা একটা মনে করিয়ে দেওয়া। শৈশব মানে শুধু বয়স নয়, একটা অনুভূতি। আমরা চাইলে আজও একটু সময় বের করে সেই অনুভূতিটাকে ছুঁতে পারি। হয়তো নিজের সন্তানের সঙ্গে মাঠে গিয়ে, কিংবা নিজের ভেতরের শিশুটাকে একটু সুযোগ দিয়ে।

জগহাটি বাওড়ের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা সেই শিশুটি আমাকে অন্তত এই কথাই মনে করিয়ে দিল—আনন্দ সব সময় বড় কিছুতে থাকে না। কখনো কখনো একটা পুরোনো টায়ারই যথেষ্ট।

শৈশব হয়তো আর ফিরে আসবে না আগের মতো। কিন্তু তার দৌড়টা থামুক না আমাদের স্মৃতিতে। সেই দৌড় আমাদের মনে করিয়ে দিক, আমরা এক সময় কতটা সহজ ছিলাম, কতটা খুশি হতে জানতাম।

ওই শিশুটার দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার ছোট্ট বেলায়। হয়তো আপনিও হারিয়ে যাবেন। আর সেটাই এই দৃশ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন