বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাদের অবদান এত গভীর যে তাদের ছাড়া পুরো সঙ্গীতভুবনের গল্পই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তেমনই এক কিংবদন্তি সুরকার ছিলেন কমল দাশগুপ্ত। কাজী নজরুল ইসলামের চার শতাধিক গানে যিনি সুর দিয়েছিলেন, অথচ জীবনের শেষভাগে তাকে কাটাতে হয়েছিল অবহেলা, দারিদ্র্য আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে। নজরুলের জন্মদিনে যখন আমরা তাঁর গান শুনি, তখন সেই গানগুলোর সুরের পেছনের মানুষটিকেও স্মরণ করা জরুরি।
“এমনি বরষা ছিল সেদিন”, “মেনেছি গো হার মেনেছি”, “ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে”, “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে”, “আমি বনফুল গো”, “সেদিন নিশীথে বরিষণ শেষে”—এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কমল দাশগুপ্তের নাম। ছোটবেলার অনেক স্মৃতির মতোই একসময় বাড়ির রেকর্ডপ্লেয়ারে এসব গান বাজতো, আর পুরো পাড়া মুগ্ধ হয়ে শুনতো। তখন হয়তো অনেকেই ভাবতেন, এসব সুর সরাসরি নজরুলেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাস্তবে সেই সুরের জাদু তৈরি করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত।
নজরুলের আস্থাভাজন সুরকার কমল দাশগুপ্ত
কাজী নজরুল ইসলাম কমল দাশগুপ্তকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে নিজের গান স্বাধীনভাবে সুর করার পূর্ণ অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, যেমন একজন বাবা তার মেয়েকে যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিয়ে শান্তি পান, তেমনই তিনি তাঁর গান কমল দাশগুপ্তের হাতে তুলে দিয়ে প্রশান্তি অনুভব করেন।
এই একটি কথাই বুঝিয়ে দেয়, নজরুল তাঁর সৃষ্টিকে কতটা নিরাপদ মনে করতেন কমলের হাতে।
বাংলা গানের জগতে এমন বিশ্বাস খুব কম শিল্পীই অর্জন করতে পেরেছেন। কমল দাশগুপ্ত শুধু সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন গানের ভেতরের আবেগকে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য কারিগর।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব
কমল দাশগুপ্তের প্রতিভা ছিল বিস্ময়কর। ১৯৩০ সালে তাঁর সুরারোপিত গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। খুব অল্প বয়সেই তিনি এইচ.এম.ভি গ্রামোফোন কোম্পানিতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ পান। মাত্র ২৩ বছর বয়সে এত বড় দায়িত্ব পাওয়া তখনকার সময়ে প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা ছিল।
জীবনে তিনি প্রায় ৮৫০০ গানে সুর করেছেন। খেয়াল, কীর্তন, কাওয়ালি, ইসলামী সঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান, নজরুলগীতি, গজল, লোকগান, মার্চ সঙ্গীত—কোনো ধারাই তাঁর হাত থেকে বাদ যায়নি। বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও তামিল চলচ্চিত্রেও তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরকার ছিলেন।
ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বিখ্যাত রণসঙ্গীত “কদম কদম বাড়ায়ে যা” তাঁরই সৃষ্টি। আজও গানটি সাহস আর উদ্দীপনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
যশোর-নড়াইলের গ্রাম থেকে সঙ্গীতের কিংবদন্তি
১৯১২ সালে যশোর-নড়াইলের বেন্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কমল দাশগুপ্ত। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি ছিল গভীর আকর্ষণ। কলকাতায় পড়াশোনা শেষ করে কুমিল্লা কলেজ থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৪৩ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব মিউজিক ডিগ্রি লাভ করেন।
সেই সময়ের উপমহাদেশে সঙ্গীত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা পাওয়া খুব সহজ ছিল না। কিন্তু কমল দাশগুপ্ত নিজের প্রতিভা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সঙ্গীতকে শুধু শিল্প নয়, এক ধরনের সাধনায় পরিণত করেছিলেন।
ফিরোজা বেগম ও কমল দাশগুপ্তের সম্পর্ক
বাংলা নজরুল সঙ্গীতের ইতিহাসে ফিরোজা বেগম ও কমল দাশগুপ্ত এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ফিরোজা বেগম যখন নজরুলগীতি গাইতেন, শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যেতেন। তাঁর কণ্ঠ আর কমলের সুর মিলে যেন এক অপার্থিব আবহ তৈরি করতো।
কিন্তু এই সম্পর্ক সামাজিকভাবে সহজ ছিল না। একজন হিন্দু সুরকারের মুসলিম নারীকে বিয়ে করা সেই সময়ের সমাজ সহজভাবে নেয়নি। ১৯৫৫ সালে ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করার পর কমল দাশগুপ্তকে নানা সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেকেই তাঁকে দূরে সরিয়ে দেন।
শুধু তাই নয়, ঢাকায় এসে তাঁকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতেও বাধ্য করা হয়। নিজের পরিচিত নাম “কমল দাশগুপ্ত” ছেড়ে তাঁকে “মোহাম্মদ কামালউদ্দিন আহমেদ” নাম গ্রহণ করতে হয়। একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় মানসিক চাপ আর কী হতে পারে!
সুরের রাজা থেকে মুদি দোকানদার
যে মানুষ একসময় হাজার হাজার গানে সুর দিয়েছেন, যিনি ছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির অন্যতম ভরসা, সেই মানুষকেই জীবনের শেষভাগে হাতিরপুলে মুদি দোকান চালাতে হয়েছিল।
দোকানের নাম ছিল “পথিক”। সেখানে তিনি তেল, নুন, মুড়ি, বিস্কুট বিক্রি করতেন। ভাবতে অবাক লাগে, যাঁর সুরে মানুষ কেঁদেছে, প্রেমে পড়েছে, স্বপ্ন দেখেছে—তাঁকেই জীবন কাটাতে হয়েছে এমন অসহায় বাস্তবতায়।
মূলত নাথ ব্যাংক ধসে যাওয়ার পর তিনি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েন। ধন-সম্পদ, খ্যাতি, সামাজিক সম্মান—সবকিছু ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।
অবহেলায় কাটানো শেষ জীবন
ঢাকায় এসেও তিনি প্রাপ্য সম্মান পাননি। বরং দারিদ্র্য, হতাশা আর অবহেলা তাঁকে ঘিরে ধরে। জীবনের শেষ দিকে তিনি নেশাসক্ত হয়ে পড়েন বলেও জানা যায়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অসুস্থ হওয়ার পর যখন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তাঁকে বিশেষ কেবিনে ভর্তি করা হয়নি। কারণ তিনি “ফার্স্ট ক্লাস গেজেটেড অফিসার” ছিলেন না।
১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই এই মহান সুরকার মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৬২ বছর।
পুত্র শাফিন আহমেদের মৃত্যু ও পুরোনো স্মৃতির ফিরে আসা
সম্প্রতি তাঁর পুত্র শাফিন আহমেদের মৃত্যুর খবর আবারও মানুষকে কমল দাশগুপ্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। শাফিন আহমেদও ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতায় জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল মনোজিৎ দাশগুপ্ত।
অনেকে বলেন, সঙ্গীতশিল্পীদের সন্তানরাও সাধারণত ভালো শিল্পী হন। শাফিন আহমেদ নিজেও জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ছিলেন। কিন্তু কমল দাশগুপ্তের মতো সুরের জাদুকর হয়ে ওঠা সত্যিই বিরল ব্যাপার।
কারণ কমল দাশগুপ্ত শুধু গান তৈরি করতেন না, তিনি গানের মধ্যে প্রাণ ঢেলে দিতেন।
বাংলা সঙ্গীত জগতের এক অনুচ্চারিত আক্ষেপ
আজ প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই এই মানুষটিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছি? তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কতজন শ্রদ্ধা জানাতে যান? তাঁর গান নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান হয় কি? নতুন প্রজন্মকে তাঁর অবদানের কথা কতটা জানানো হয়?
বাংলা গানের অনেক ইতিহাস লেখা হয়, কিন্তু কমল দাশগুপ্তের নাম অনেক সময়ই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ আধুনিক বাংলা গান, নজরুলগীতি ও চলচ্চিত্র সঙ্গীতের বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অনন্য।
তিনি শুধু একজন সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সঙ্গীতের এক যুগ নির্মাতা।
আজ যখন তাঁর সুরে বাঁধা কোনো পুরোনো গান কানে ভেসে আসে, তখন মনে হয়—এই মানুষটিকে আমরা হয়তো যথেষ্ট ভালোবাসতে পারিনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনো বেঁচে আছে। আর যতদিন বাংলা গান থাকবে, কমল দাশগুপ্ত নামটিও ততদিন অমর হয়ে থাকবে।
সূত্র: লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ফেসবুক থেকে নেয়া।
