যশোরের ইতিহাস বললেই আমরা সাধারণত স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বেশি শুনি। কিন্তু এর মাঝেই লুকিয়ে আছে এক অবহেলিত অথচ গর্বের অধ্যায়—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত ‘বেঙ্গলি ডাবল কোম্পানি’। এই গল্পটা একটু অন্যরকম। এখানে আছে স্বপ্ন, ত্যাগ, আর এক অদ্ভুত সময়ের বাস্তবতা—যেখানে শিক্ষিত বাঙালি তরুণরা যুদ্ধক্ষেত্রে পা রেখেছিলেন, কিন্তু অস্ত্র হাতে নয়, দায়িত্বের বোঝা নিয়ে।
১৯১৬ সালের মাঝামাঝি সময়। বিশ্বজুড়ে তখন প্রথম মহাযুদ্ধের উত্তাপ। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারছিল, ভারতীয়দের—বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালিদের—সমর্থন ধরে রাখা জরুরি। এই লক্ষ্যেই তারা গঠন করে একটি প্রতীকী সামরিক ইউনিট, যার নাম দেওয়া হয় ‘Bengali Double Company’।
শুরুতে পরিকল্পনা ছিল মাত্র দুটি কোম্পানি নিয়ে। কিন্তু খুব অল্প সময়েই চিত্র বদলে যায়। আগ্রহী তরুণদের ভিড়ে সদস্য সংখ্যা কয়েকশ’ ছাড়িয়ে যায়। এই বাহিনী মূলত শিক্ষিত, শহুরে, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বাঙালিদের নিয়ে গড়ে ওঠে। এক কথায়, তখনকার সমাজের “ভদ্রলোক” শ্রেণির প্রতিনিধিরাই ছিলেন এই ইউনিটের মুখ্য অংশ।
এই বাহিনীতে যশোর থেকেও যোগ দেন ১৯ জন তরুণ। ভাবতে অবাক লাগে, তখনকার দিনে যখন বিদেশে যাওয়া বা যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া এত সহজ ছিল না, তখন এই তরুণরা স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম কুমার অধিক্রম মজুমদার। তিনি ছিলেন রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদারের পুত্র এবং কলকাতা হাইকোর্টের একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। কিন্তু পেশার নিশ্চয়তা ছেড়ে তিনি যোগ দেন এই বাহিনীতে। এটা শুধু একটা সিদ্ধান্ত না—এটা ছিল এক ধরনের আত্মত্যাগ।
একই সময় এই ইউনিটে যোগ দিয়েছিলেন পরবর্তীকালের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তখনও তিনি বিখ্যাত নন, কিন্তু তাঁর ভেতরের আগুনটা হয়তো তখন থেকেই জ্বলছিল।
১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দলটি যাত্রা শুরু করে। তারা লাহোর হয়ে পৌঁছায় নওশেরায়। সেখানে শুরু হয় তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ।
এই সময়ের একটি মানবিক দিকও সামনে আসে। নওশেরা থেকে কুমার অধিক্রম মজুমদার তাঁর পিতাকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠির ভিত্তিতে যদুনাথ মজুমদার ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকায় একটি আশ্বাসমূলক বার্তা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তরুণরা ভালো আছে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে—যদিও তখনও তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়নি।
ভাবো একবার, সেই সময়কার বাবা-মায়েদের উদ্বেগটা কেমন ছিল! ফোন বা ইন্টারনেট তো ছিল না। একটা চিঠিই ছিল একমাত্র ভরসা।
১৯১৭ সালের জুলাই মাসে এই বাহিনীর একটি অংশকে পাঠানো হয় মেসোপটেমিয়ায়, যা বর্তমানে ইরাক অঞ্চল। এই দলে ছিলেন কুমার অধিক্রম মজুমদার, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, ঢাকার খাজা হাবিবুল্লাহসহ আরও অনেকে।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তারা সরাসরি যুদ্ধ করেননি। তাদের দায়িত্ব ছিল গ্যারিসন ডিউটি, পাহারা দেওয়া, বার্তা পৌঁছে দেওয়া—এই ধরনের সহায়ক কাজ।
অনেকে ভাবতে পারে, “তাহলে কি তারা কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল?” আসলে না। যুদ্ধের ময়দানে এই ধরনের কাজগুলোই পুরো ব্যবস্থাকে সচল রাখে। সামনে যারা লড়াই করে, তাদের পিছনে এই মানুষগুলোর অবদান অনেক বড়।
মেসোপটেমিয়ার কঠিন আবহাওয়া, অপরিচিত পরিবেশ আর সীমিত চিকিৎসা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে। ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে পুরো ইউনিট বাগদাদে পৌঁছায়। কিন্তু ততদিনে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
দুঃখজনকভাবে, অসুস্থতার কারণে কয়েকজন বাঙালি সৈন্য সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তাদের নাম ইতিহাসে তেমনভাবে লেখা হয়নি, কিন্তু তাদের ত্যাগ কোনো অংশে কম নয়।
ভাবলে কষ্ট লাগে—নিজের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, অচেনা এক শহরে, নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেছে তাদের জীবন।
‘ডাবল কোম্পানি’ নামটা শুনে মনে হতে পারে ছোট একটা ইউনিট। কিন্তু বাস্তবে ১৯১৭ সালের মধ্যেই এর সদস্য সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যায়।
পরবর্তীতে এই ইউনিটকে সম্প্রসারণ করে ‘Forty Ninth Bengalis’ নামে একটি বৃহত্তর বাহিনী গঠন করা হয়। তখন সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৮০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
এটা প্রমাণ করে, শুরুতে প্রতীকী উদ্যোগ হলেও, পরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় কথা হলো—যশোরের এই তরুণরা তখনকার বৈশ্বিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তারা হয়তো সরাসরি যুদ্ধ করেননি, কিন্তু এক পরিবর্তনশীল সময়ের সাক্ষী ছিলেন।
তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের ত্যাগ—সব মিলিয়ে তারা ইতিহাসের এমন এক পাতায় নাম লিখেছেন, যা খুব কমই আলোচনায় আসে।
দুঃখের বিষয়, যশোরের যে যুবক ওই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁর নাম আজও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। কিন্তু নাম না জানা মানেই তো অবদান কম নয়, তাই না?
এই গল্পটা শুধু অতীতের নয়। এটা আমাদের শেখায়—একটা সময় ছিল, যখন বাঙালি তরুণরা নিজেদের আরামের জীবন ছেড়ে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
আজ আমরা হয়তো অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বাঁচি, কিন্তু তাদের সেই সাহস আর দায়িত্ববোধ আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
যশোরের ইতিহাসের এই অধ্যায়টা তাই শুধু গর্বের নয়, শেখারও। এটা মনে করিয়ে দেয়—আমাদের শিকড় কত গভীরে, আর সেই শিকড়ে কত গল্প লুকিয়ে আছে।
এই গল্পটা যতবার ভাবি, মনে হয়—ইতিহাসের অনেক বড় বড় ঘটনার আড়ালে ছোট ছোট মানুষের অবদান চাপা পড়ে যায়। কিন্তু আসল শক্তিটা তো তাদের মধ্যেই থাকে।
লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।

