বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে একদিকে জ্বালানি সাশ্রয় হয়, আর অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি সচল থাকে।
এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি দোকানপাট ও শপিংমলের খোলা রাখার সময়সীমায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতা—দু’পক্ষের জন্যই বড় স্বস্তির খবর।
আগে যেখানে দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনা ছিল, সেখানে এখন সেই সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ৭টা পর্যন্ত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সময় পাচ্ছেন, আর ক্রেতারাও একটু স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারছেন।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। ফলে দেশের সব বিপণিবিতান এখন নতুন সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
এখানে একটা বাস্তব বিষয় আছে। সামনে আসছে বড় দুটি উৎসব—ঈদুল আজহা এবং পহেলা বৈশাখ। এই সময়টাতে সাধারণত বাজারে মানুষের ভিড় অনেক বেশি থাকে। নতুন পোশাক, উপহার, প্রয়োজনীয় জিনিস—সব মিলিয়ে কেনাকাটার চাপ বেড়ে যায়।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বারবার বলছিল, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ করলে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। কারণ দিনের বড় একটা সময় ক্রেতারা কাজ বা অফিস শেষে সন্ধ্যার পরেই বাজারে আসেন।
এই বিষয়টি বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সময়সীমা এক ঘণ্টা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। ফলে ব্যবসায়ী এবং কর্মচারী—দুই পক্ষই কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
একটু পেছনের গল্প বলি। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলেন, দোকান বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৬টাই থাকবে। তখন অনেক ব্যবসায়ী হতাশ হয়েছিলেন।
কিন্তু পরে ব্যবসায়ীদের জোরালো দাবির কারণে বিষয়টি আবার বিবেচনায় আনা হয়। শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এটা দেখলেই বোঝা যায়, সরকার চেষ্টা করছে পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতে।
অনেকে হয়তো ভাবছেন এই সময় বাড়ানোর ফলে কি জ্বালানি সংকট আরও বাড়বে?
এই প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এপ্রিল মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। শুধু তাই না, আগামী তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোল ও অকটেনও সংরক্ষণ করা আছে।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কিছু উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাস জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলেই আশা করা হচ্ছে।
সরকার শুধু শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ভাবছে না, গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের কথাও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
এখন চলছে সেচ মৌসুম। এই সময় কৃষকদের জ্বালানি তেলের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়। তাই সরকার নির্দেশ দিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) এই বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো কৃষক সেচের জন্য সমস্যায় না পড়েন। কারণ কৃষি উৎপাদন ঠিক থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও ঠিক থাকে।
বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ দোকান মালিক এবং প্রায় আড়াই কোটি কর্মচারী এই খাতের সাথে জড়িত। ভাবতে পারেন, এই সংখ্যা কত বড়!
দোকান খোলা রাখার সময় কমিয়ে দিলে তাদের আয় সরাসরি কমে যেত। বিশেষ করে উৎসবের আগে এই ধরনের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারত।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই সরকার সময় বাড়িয়েছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল থাকবে, এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে।
যদিও দোকানপাটের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু অফিস-আদালতের সময়সূচি আগের মতোই থাকছে। অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্তই সরকারি-বেসরকারি অফিস চলবে।
এখানে সরকার একটা ভারসাম্য রাখতে চাচ্ছে—একদিকে জ্বালানি সাশ্রয়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখা।
একটু সহজভাবে বলি—ধরুন আপনি সারাদিন অফিস করে সন্ধ্যায় বাজারে যেতে চান। আগে ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ হয়ে গেলে আপনি ঠিকমতো কেনাকাটা করতে পারতেন না।
এখন রাত ৭টা পর্যন্ত সময় থাকায় আপনি একটু স্বস্তিতে বাজার করতে পারবেন। বিশেষ করে উৎসবের সময় এই বাড়তি এক ঘণ্টা অনেক কাজে লাগবে।

