Homeটকিং পয়েন্ট৫০ বছর পর জিয়া খালের পুনর্জাগরণ—শার্শার কৃষিতে কি আসছে নতুন বিপ্লব?

৫০ বছর পর জিয়া খালের পুনর্জাগরণ—শার্শার কৃষিতে কি আসছে নতুন বিপ্লব?

১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া এই খাল খনন কর্মসূচি হাজার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে উঠেছিল এবং বদলে দিয়েছিল পুরো অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা।

Share

যশোর জেলার শার্শা উপজেলার উলাশী অঞ্চল একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি উন্নয়নের একটি প্রতীকী নাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। সেই পরিচিতির কেন্দ্রে ছিল উলাশী জিয়া খাল—একটি স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল খনন উদ্যোগ, যা একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা নিরসনে ভূমিকা রেখেছিল, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই ঐতিহাসিক খালটি আজ পুনঃখননের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে, যা স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি Ziaur Rahman বেতনা নদীর সংযোগস্থল উলাশী–যদুনাথপুর এলাকায় প্রায় ৪.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেন। সেই সময়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন—উত্তর শার্শার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলাবদ্ধতা, অনিয়মিত পানি নিষ্কাশন এবং কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তায় ভুগছিল। খাল খননের এই উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে একটি গণআন্দোলনভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে খালটি উদ্বোধনের পর এর সুফল দ্রুতই দৃশ্যমান হতে থাকে। সোনামুখী, বনমান্দারসহ প্রায় ২২টি বিল অঞ্চলের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং হাজার হাজার একর কৃষিজমি পুনরায় চাষাবাদের আওতায় আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি বাস্তব ও কার্যকর মডেল, যা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ে খাল খনন কর্মসূচির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং “জিয়া মডেল” নামে পরিচিতি লাভ করে।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহাসিক অবকাঠামোটি আর আগের অবস্থায় টিকে থাকতে পারেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রাকৃতিক পলি জমা এবং পানি প্রবাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে খালটি ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। বর্তমানে খালের বহু অংশ ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও অল্প পানি জমে থাকলেও তা কৃষি বা নিষ্কাশনের জন্য কার্যকর নয়।

স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই অবস্থা তাদের কৃষি কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ফসলি জমি দীর্ঘ সময় পানিতে তলিয়ে থাকে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দেয়। একসময় যে খাল কৃষি উৎপাদনের প্রাণশক্তি ছিল, সেটিই এখন কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় উলাশী জিয়া খাল পুনঃখননকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব একযোগে খালটির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান সরেজমিনে খাল এলাকা পরিদর্শন করে এর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করেন। পরিদর্শনকালে খাল পুনঃখননের প্রযুক্তিগত দিক, পানি প্রবাহ পুনঃস্থাপন এবং স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হয়।

স্থানীয় পর্যায়ে এই উদ্যোগকে শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণের একটি প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পুনঃখনন কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন সার্ভে, GIS ম্যাপিং, ডিজিটাল টপোগ্রাফিক বিশ্লেষণ এবং জলপ্রবাহ সিমুলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে খালের বর্তমান অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে খালটির গভীরতা, প্রবাহ পথ এবং পানি ধারণক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে খাল পুনঃখনন শুধু একটি খনন কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা মডেলে রূপ নিতে পারবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় এই ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় মানুষের মধ্যে এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রবীণদের অনেকেই স্মৃতিচারণ করেন সেই সময়ের, যখন খাল খননের সময় পুরো এলাকা একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ একত্রে অংশ নিয়েছিল মাটি কাটার কাজে, যা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ছিল না, বরং সামাজিক ঐক্য ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ ছিল। তাদের মতে, সেই ঐতিহ্য আবার ফিরে এলে গ্রামীণ সমাজে নতুন করে ঐক্য ও উন্নয়নবোধ জাগ্রত হবে।

অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম এই প্রকল্পকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, যদি আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ও পরিবেশগত পরিকল্পনা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এই খাল শুধু কৃষির জন্য নয়, বরং স্থানীয় পরিবেশ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য এবং জলবায়ু সহনশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে উলাশী জিয়া খাল পুনঃখনন উদ্যোগটি একটি বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করছে। এটি একদিকে ইতিহাসের পুনরুজ্জীবন, অন্যদিকে আধুনিক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত একটি পানি প্রবাহ ব্যবস্থাকে পুনরায় সচল করার এই প্রচেষ্টা সফল হলে, তা শার্শা উপজেলার পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।
মোবাইল: ০১৩০০৮৩২৮৬৮

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন