বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্যখাতের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—ড. মুহাম্মদ ইউনূস কী ভিত্তিতে নূরজাহান বেগমকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন? এই প্রশ্নটি সামনে এনেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
তার বক্তব্য শুধু একটি ব্যক্তিগত মত নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহি নিয়ে একটি বড় আলোচনার সূচনা করেছে।
এই নিবন্ধে আমরা বিষয়টি বিশ্লেষণ করব—নিয়োগের প্রেক্ষাপট, স্বাস্থ্যখাতের পরিস্থিতি, টিকা সংকট এবং কেন জবাবদিহির প্রশ্নটি এখন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগমকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন ব্যাংকিং পেশাজীবী কীভাবে স্বাস্থ্যখাতের মতো জটিল ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পেলেন?
জুলকারনাইন সায়ের সরাসরি এই বিষয়টি তুলে ধরে জানতে চেয়েছেন, এই নিয়োগের পেছনে কী ধরনের পেশাগত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা হয়েছিল। স্বাস্থ্যনীতি, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা চিকিৎসা প্রশাসনে তার কোনো দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা ছিল কি না—এ নিয়েও জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এই ধরনের নিয়োগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে যখন স্বাস্থ্যখাতের সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি। তবে সায়েরের মতে, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা সম্মান কোনো সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত করে না। বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জবাবদিহি থাকা জরুরি।
তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, যারা ড. ইউনূসকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন, তাদেরও উচিত সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিষয়গুলো দেখা। কারণ একজন নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার সিদ্ধান্তের ফলাফল দিয়ে।
এখানে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়—ধরুন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালেন। তখন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলে দায়টা কার ওপর পড়বে? ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি অপরিহার্য।
সায়ের তার বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি গুরুতর সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—টিকার সংকট। তার দাবি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি ও ওপি ব্যবস্থা) বাতিল করে দেয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে দেশে হামসহ প্রায় ৮-১০টি রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—হামের প্রকোপে ৪১ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ টিকা একটি দেশের জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। টিকার ঘাটতি মানে সরাসরি শিশুদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
নূরজাহান বেগম স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে কী কী কাজ করেছেন, তা এখনো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সায়েরের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা।
জনগণের জানার অধিকার রয়েছে—
কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,
কেন নেওয়া হয়েছে,
এবং তার ফলাফল কী হয়েছে।
স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস বাড়ে। আর স্বাস্থ্যখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই অবিশ্বাস মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বিতর্ক আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো কি ব্যক্তিনির্ভর হবে, নাকি নীতিনির্ভর?
যদি কোনো সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তাহলে সেখানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু যদি একটি শক্তিশালী নীতিমালা ও যোগ্যতার মানদণ্ড থাকে, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি হাসপাতালের পরিচালক যদি চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা না রাখেন, তাহলে তার সিদ্ধান্তগুলো রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একইভাবে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই জানতে চাইছেন—এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কি কোনো যাচাই-বাছাই করা হয় না?
মানুষ এখন শুধু তথ্য জানতে চায় না, তারা ব্যাখ্যাও চায়। তারা জানতে চায়—কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জনগণের এই সচেতনতা ইতিবাচক। কারণ একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে নাগরিকদের প্রশ্ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু বিষয় অত্যন্ত জরুরি:
প্রথমত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত স্বচ্ছভাবে তথ্য প্রকাশ করা।
দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড স্পষ্ট করা।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যখাতে চলমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা।



