Homeশিল্প ও সাহিত্যরাতের অন্ধকারে কারা এসেছিল? “ওরা কারা” ভয়ের ছোট গল্প!

রাতের অন্ধকারে কারা এসেছিল? “ওরা কারা” ভয়ের ছোট গল্প!

Share

বগুলাপাড়া থেকে চার কিলোমিটার দূরে পুস্থিঘাটা গ্রামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গ্রামীণ যাত্রা পালা। নামটা শুনলেই গা ছমছম করে ‘বাঘিনী শাশুড়ির নাগিন বউ’। শীতের রাত। আকাশ জুড়ে শুক্লপক্ষের ভাঙা চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল, আর হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছিল গোটা গ্রাম।

শহর থেকে মাস তিনেক হলো গ্রামে এসে ঘর বেঁধেছে মনি ও শুক্লা। গ্রামের পরিবেশ, এই যাত্রা দেখা— সব মিলিয়ে তারা দারুণ রোমাঞ্চিত। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঠিক রাত আটটায় মনিকে নিয়ে বাইকে করে তারা দুজনে যাত্রা দেখতে যাবে।

কিন্তু বাইক স্টার্ট দিতেই পাশের বাড়ি থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো শুভ আর স্নিগ্ধ। একজন নবম, অন্যজন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে— দুজনেই পাড়ার দস্যি ছেলে। ওদের চোখেমুখে অদ্ভুত উত্তেজনা।

“মনিদা, শুক্লাদি! তোমরা যাত্রা দেখতে যাচ্ছ? আমরাও যাব!” স্নিগ্ধ একদমে বলে ফেলল। মনি হেসে বলল, “কিন্তু বাইকে তো আর জায়গা নেই রে।” শুভ ঝটপট বলল, “আরে তাতে কী! আমাদের তো সাইকেল আছে। আমরা সাইকেল চালিয়ে চলে যাব।”

শুক্লা কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল, “রাতের বেলা, অত দূর… পথ চিনিস তো?” ওরা দুজনে একযোগে মাথা নেড়ে বলল, “লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ঠিক পৌঁছে যাব। তোমরা আগে যাও, আমরা আসছি।”

নিরুপায় হয়ে মনি আর শুক্লা বাইকে চেপে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আর শুভ ও স্নিগ্ধ তাদের সাইকেলে চেপে পেছু নিল।


কিছুটা পথ শুভ চালালো, তারপর স্নিগ্ধ। গ্রামের নির্জন পথ। ভাঙা চাঁদের আলোতে চারপাশটা কেমন যেন বিভ্রম তৈরি করছিল। দুপাশে ঘন বাঁশঝাড়, আর মাঝে মাঝে প্রাচীন বড় বড় গাছ। গাছের পাতা নড়ার শব্দটাও যেন কোনো চাপা ফিসফিসানি। হঠাৎ করেই পথটা কেমন যেন বদলে গেল। যেখানে শেষবার একটা পুকুর দেখেছিল, সেখানে এখন শুধু বড় বড় আকাশমনি গাছের জঙ্গল।

“রাস্তাটা ভুল হলো না তো?” শুভ ভীত গলায় জিজ্ঞেস করল। “নাহ্, লোক তো বলেছিল পুকুরের পরেই ডানদিকের রাস্তা,” স্নিগ্ধ উত্তর দিল, যদিও তার গলাতেও ভয়ের ছাপ।

কিন্তু রাস্তা আর সোজা হলো না। তারা এক গভীর অন্ধকারে ঢুকে পড়ল। হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ তাদের কানে এলো। মাইকে যেন কেউ মন্ত্র পড়ছে বা ঢাকের আওয়াজ। ওদের সাইকেলের প্যাডেল দ্রুত চলল। আওয়াজটার কাছে যেতেই দেখল, সেখানে যাত্রা হচ্ছে না। সেটা আসলে একটা পুরোনো, ভাঙাচোরা শ্মশান। দূরে শ্মশানকালীর ছোট্ট মন্দিরটা মিটমিট করে জ্বলা টিমটিমে আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মাইকটা বাজছে, কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।

“এখানে তো কেউ নেই রে,” শুভ কাঁপা গলায় বলল। তখনই হঠাৎ অন্ধকার থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “কাকে খুঁজছো?”


দুজনে চমকে পেছন ফিরল। আধো অন্ধকারে দেখল দুটি কিশোর, তাদের সমবয়সীই হবে। কিন্তু পরনে অদ্ভুত, প্রাচীন পোশাক। ওদের মুখগুলো ফ্যাকাসে, আর চোখগুলো ভীষণ গভীর। শুভ আর স্নিগ্ধ মনে মনে ভাবল, নির্জন শ্মশানে এই রাতে ওরা কারা?


“আমরা যাত্রা দেখতে যাচ্ছিলাম… ‘বাঘিনী শাশুড়ির নাগিন বউ’,” স্নিগ্ধ কোনোরকমে বলল।

সেই রহস্যময় কিশোরদের একজন অদ্ভুতভাবে হাসল। “এখানে কোনো যাত্রা হচ্ছে না। এটা শ্মশান, এখানে কোনো বিনোদন হয় না; এখানে হয় দুঃখের বহিঃপ্রকাশ।” “না? তাহলে আওয়াজ…?” শুভ থমকে গেল। অন্য কিশোরটি বলল, “এই আওয়াজ শুধু তোমাদের মতো ভুল মানুষদের জন্যই বাজে। যাও, বাড়ি ফিরে যাও।”

শুভ ও স্নিগ্ধ ভয়ে সাইকেল ঘোরাতে চাইল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের পা জড়ানো মনে হচ্ছিল। সেই কিশোররা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত সব গল্প বলতে শুরু করল। ওদের গল্পগুলো সম্মোহনী, এক অদ্ভুত মায়াভরা। ওদের কথার জালে শুভ আর স্নিগ্ধ যেন সব কিছু ভুলে গেল— কোথায় তারা এসেছে, কেন এসেছে। তাদের শুধু মনে হচ্ছিল, এই কিশোরদের সাথেই থাকা উচিত। ঘুমে তাদের দুচোখ জড়িয়ে আসছিল।

অন্যদিকে যাত্রার প্যান্ডেলে মনি আর শুক্লা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিল। যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। ভিড় জমেছে প্রবল। মাইকে তখন নাগিন বউয়ের ডায়ালগ শোনা যাচ্ছে। প্যান্ডেলের এক কোণে বসে মনি ও শুক্লা বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছিল। খানিক বাদে, হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে শুভ আর স্নিগ্ধকে সাইকেল চালিয়ে ঢুকতে দেখল।

“কিরে! এত দেরি হলো কেন?” মনি গম্ভীর মুখে বলল। শুভ উত্তর দিল না, শুধু একটা ফ্যাকাশে হাসি হাসল। স্নিগ্ধ বলল, “পথ ভুল হয়েছিল গো।”

ওরা মনিদের পাশেই বসল। কিন্তু ওদের আচরণ ছিল অদ্ভুত। ওরা কিছুই বলছিল না, শুধু চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। মেলার তেলে ভাজা কিনতে গেলে ওরা হাতও লাগাল না। মনি ওদের দিকে তেলে ভাজার ঠোঙা বাড়িয়ে দিল। ওরা অদ্ভুতভাবে খেল— যেন হাত দিয়ে কিছু ধরছে না, শুধু মুখটাই ঠোঙার ভেতর নিয়ে গেছে। মনি অবাক হয়ে ভাবল, ছেলেদের আচরণ এমন বদলে গেল কেন? আসলেও ওরা কারা?

রাত বাড়ায় মনিরা ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। শুভ আর স্নিগ্ধকেও রাজি করাল। কিন্তু ওরা কিছুতেই রওনা দিল না। ঘোলা চোখে শুভ উত্তর দিল, “তোমরা যাও, আমরা আসছি।”

অগত্যা মনি আর শুক্লা বাইক স্টার্ট দিল। পথে ফিরতে ফিরতে শুক্লা বলল, “ওদের কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল না? মুখটা কেমন ফ্যাকাশে রক্তবর্ণ দেখাচ্ছিল দেখেছ?” মনি উত্তর দিল না, শুধু বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল।

কিছুটা পথ আসার পর দেখে, রাস্তার একপাশে একটা ভিড় জমেছে। কয়েকজন লোক টর্চ হাতে জটলা করছে। কৌতূহলবশত মনি বাইক থামাল। ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই মনি আর শুক্লার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মাটিতে জ্ঞান হারিয়ে শুয়ে আছে শুভ আর স্নিগ্ধ! ওদের শরীর দুটো ফ্যাকাশে, মুখটা যন্ত্রণায় বিকৃত।

“শুভ! স্নিগ্ধ!” মনি চেঁচিয়ে উঠল। “কিরে! কী হলো তোদের? তোরা তো আমাদের সাথেই যাত্রা দেখছিলি!” ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন, “তুমি কী বলছো বাবা? এরা তো ঘণ্টা তিনেক ধরে এইখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আমি আমার মাইকের তার ঠিক করতে এসে এই শ্মশানের কাছেই এদের দেখতে পাই।”

মনি অবাক হয়ে শুক্লার দিকে তাকাল। শুক্লার মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। “তবে যাত্রা দেখল কে? তেলে ভাজা খেল কে?” মনি স্বগতোক্তি করল।

সে তার বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলতে থাকা ঠোঙাটার দিকে তাকাল। সেটার ভেতর থেকে এক বিদঘুঁটে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছিল। সাহস করে ঠোঙাটা খুলতেই দেখল, সেখানে কোনো তেলে ভাজা নেই! আছে শুধু শ্মশানের পোড়া কাঠ আর ছাই, তার মাঝে কালো রঙের সাপের চামড়া!

অন্ধকারের গভীর থেকে একটা তীব্র, অদ্ভুত হাসি ভেসে এলো— ঠিক সেই রহস্যময় কিশোরদের হাসির মতো। দূর থেকে ভেসে আসছিল শ্মশানের মাইকের আওয়াজ ‘বাঘিনী শাশুড়ির নাগিন বউ’ যাত্রা তখনো চলছে, কিন্তু সেই আওয়াজ যেন এক বিভীষিকার গল্প বলছিল।


মনি ও শুক্লা বুঝল, সেই রহস্যময় কিশোরেরা সাধারণ কেউ ছিল না। শুভ ও স্নিগ্ধর রূপ ধরে হয়তো তাদের সঙ্গে এতক্ষণ যাত্রা দেখছিল দুটো অতৃপ্ত আত্মা। মনি শুক্লার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, “যত মানুষ মেলায় দেখেছি, সবাই কি প্রকৃতপক্ষে মানুষ ছিল? এমন করে কত আত্মাই হয়তো আমাদের সঙ্গী হয়েছিল একটু বিনোদনের আশায়। আসলে আমরা যাদের দেখেছি, ওরা কারা তা বোধহয় অজানাই থেকে যাবে।”

শীতের রাতে, গ্রামের নিঝুম পথে দাঁড়িয়ে মনি ও শুক্লার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তারা বুঝল, চোখের দেখা সব সময় সত্যি হয় না— বিশেষ করে এই রহস্যময় গ্রামীণ রাতের পরিবেশে।

—রাহুল রাজ

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন