বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ এক গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।
এমন কঠিন সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত আবারও এগিয়ে এসে বাংলাদেশকে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ৫০০০ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করে ভারত বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইনের ব্যাঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি একসাথে এই সমস্যাকে তীব্র করেছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, নির্দিষ্ট পরিমাণে জ্বালানি বিক্রির সীমাবদ্ধতা এবং রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে ভারত আবারও বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লির এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে ৫০০০ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনও এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এই সরবরাহ কেবল একটি এককালীন সহায়তা নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ। নতুন করে এই ৫০০০ মেট্রিক টন ডিজেল যুক্ত হওয়ায় মোট সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০০০ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ, ভারত শুধু সহায়তা করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকেও এগোচ্ছে।
এই ডিজেল সরবরাহের একটি বড় দিক হলো—এটি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছানো হচ্ছে। অসমের নুমালিগড় তেল শোধনাগার থেকে এই ডিজেল পাঠানো হচ্ছে, যা পরিবহন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করেছে।
আগামী ২৮ মার্চ আরও ৬০০০ মেট্রিক টন ডিজেল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ভারতের লক্ষ্য এপ্রিল মাসের মধ্যে মোট ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে সরবরাহ করা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট অনেকটাই লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ছিল, যার আওতায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১.৮০ লক্ষ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের কথা ছিল। তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সেই চুক্তি মাঝপথে স্থগিত হয়ে যায়।
বর্তমানে নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলেই পুনরায় জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। বলা যায়, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখন অনেক জায়গায় মোটরসাইকেলে মাত্র ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আগাম ঈদের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও প্রভাব পড়ছে।
সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো গ্যাসের কালোবাজারি। রান্নার গ্যাস এখন ২ থেকে ৩ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য রান্না করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, যেমন কাঠ বা কয়লা। এতে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আরও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
যদি ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী নিয়মিত ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে শুধুমাত্র বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে দেশের নিজস্ব জ্বালানি নীতি ও বিকল্প উৎসের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সোলার বা উইন্ড এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।



