ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। লিগ আয়োজন হবে কি না, হলে কবে শুরু হবে—এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল ফুটবলপ্রেমীদের মনে।
তবে হঠাৎ করেই বড় এক সুখবর সামনে এসেছে। লন্ডনভিত্তিক একটি সংস্থা আইএসএলের কমার্শিয়াল রাইটসের জন্য প্রায় ২০০০ কোটিরও বেশি টাকার বিশাল বিড করেছে, যা পুরো পরিস্থিতিকেই বদলে দিতে পারে।
গত কয়েক বছরে আইএসএল ভারতের ফুটবল সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু এবারের আসর শুরু হওয়ার আগে নানা জটিলতায় পড়তে হয় আয়োজকদের। আগে যেভাবে এফএসডিএল (Football Sports Development Limited) লিগটি পরিচালনা করত, সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর নতুন করে কে এই দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে তৈরি হয় বড়সড় ধোঁয়াশা।
এমন পরিস্থিতিতে একাধিকবার টেন্ডার ডাকা হলেও প্রথম দিকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক জটিলতা, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজও চলছিল। সব মিলিয়ে আইএসএল শুরুর সময় পিছিয়ে যায় এবং সংক্ষিপ্ত লিগ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেই লন্ডনের সংস্থা ‘জিনিয়াস স্পোর্টস’ এগিয়ে এসেছে এক বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে। তারা আইএসএল ও ফেডারেশন কাপের কমার্শিয়াল রাইটসের জন্য ২০ বছরের চুক্তিতে প্রায় ২১২৯ কোটি টাকার বিড করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, শুরুর দিকে বছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা দেওয়া হবে। এরপর ধীরে ধীরে এই অঙ্ক বাড়তে বাড়তে মোট বিনিয়োগ ২১২৯ কোটিতে পৌঁছাবে। আগের তুলনায় এটি অনেক বেশি, যা ভারতীয় ফুটবলের জন্য বড় এক আর্থিক সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আয় থেকে ক্লাবগুলোও নির্দিষ্ট অংশ পাবে। ফলে শুধু লিগ নয়, ক্লাব পর্যায়ের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
আগে এফএসডিএল ১৫ বছরের জন্য আইএসএল পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। তারা লিগকে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে। তবে নতুন প্রস্তাবটি শুধু টাকার অঙ্কেই বড় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জিনিয়াস স্পোর্টস ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করেছে। তারা ফিফা এবং এএফসি’র মতো বড় সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা আইএসএলকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
এই টেন্ডারে শুধু জিনিয়াস স্পোর্টস নয়, ‘ফ্যানকোড’ নামের আরেকটি সংস্থাও অংশ নিয়েছে। তারা বছরে ৩৬ কোটি টাকার বিড করেছে, যা প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাড়বে।
তবে অর্থের দিক থেকে জিনিয়াস স্পোর্টস অনেকটাই এগিয়ে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাদেরই এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থা (এআইএফএফ) জানিয়েছে, ২৯ মার্চ তাদের এক্সিকিউটিভ কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখানেই এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এআইএফএফ-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি আগের চুক্তির চেয়েও ভালো প্রস্তাব। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কিছু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব শুধু একটি লিগের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। বেশি অর্থ মানে উন্নত অবকাঠামো, ভালো প্রশিক্ষণ, বিদেশি কোচ ও খেলোয়াড় আনার সুযোগ—সব মিলিয়ে খেলার মান উন্নত হবে।
ভাবো তো, যদি ক্লাবগুলো নিয়মিত ভালো অর্থ পায়, তারা নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে পারবে, একাডেমি গড়তে পারবে। এতে করে স্থানীয় ফুটবলারেরাও সুযোগ পাবে নিজেদের প্রমাণ করার।
শুধু পুরুষদের আইএসএল নয়, ভারতীয় মহিলা ফুটবলেও বিনিয়োগের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ‘ক্যাপরি স্পোর্টস’ নামে একটি সংস্থা মহিলা লিগ ও তার দ্বিতীয় ডিভিশনের জন্য ২০ বছরের চুক্তিতে ১৬৫ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছে।
এটি মহিলা ফুটবলের জন্য বড় এক ইতিবাচক দিক। এতদিন যে খাতটি অবহেলিত ছিল, সেখানে নতুন করে প্রাণ ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একটা সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরো, একটা ক্লাবের কাছে যদি পর্যাপ্ত টাকা না থাকে, তারা ভালো খেলোয়াড় কিনতে পারবে না, ভালো কোচ আনতে পারবে না। ফলে খেলার মানও উন্নত হবে না।
কিন্তু যখন বড় বিনিয়োগ আসে, তখন পুরো সিস্টেমটাই বদলে যায়। খেলোয়াড়দের বেতন বাড়ে, অবকাঠামো উন্নত হয়, দর্শকদের আগ্রহও বাড়ে। ঠিক এমনটাই হতে পারে আইএসএল-এর ক্ষেত্রেও।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, আইএসএল এখন এক নতুন মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্বস্তির খবর এনে দিয়েছে।
এখন চোখ থাকছে ২৯ মার্চের বৈঠকের দিকে। সেখানেই নির্ধারিত হবে, কে আগামী ২০ বছর আইএসএলের দায়িত্ব নেবে এবং ভারতীয় ফুটবল কোন পথে এগোবে।
যদি এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আইএসএল শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে—এটা বলাই যায়।


