মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যেন দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধবিরতির আশা যখন একটু একটু করে সামনে আসছিল, ঠিক তখনই সেই আশায় যেন ঠান্ডা জল ঢেলে দিল ইরান। সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নির্দেশ মানবে না। শুধু তাই নয়, আমেরিকার সঙ্গে কোনও আলোচনায় বসার আগ্রহও দেখাচ্ছে না তেহরান।
এখন পুরো ব্যাপারটা এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে একেবারে অনড়। ফলে শান্তির বদলে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির বিষয়টা অনেকটা এমন—দুইজন মানুষ ঝগড়া করছে, কিন্তু কেউই আগে “ঠিক আছে, বসে কথা বলি” বলতে রাজি নয়। এখানেও একই অবস্থা।
ইরান স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা মার্কিন প্রস্তাব খতিয়ে দেখেছে, কিন্তু তাতে রাজি হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তাদের মতে, আমেরিকা বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পাঠালেও সেটা সরাসরি আলোচনার সমান নয়।
আব্বাস আরাঘচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এক বিবৃতিতে বলেন—তারা সংঘাতের স্থায়ী সমাধান চায় ঠিকই, কিন্তু সেটা তাদের শর্ত মেনে নিতে হবে। শুধু কথার কথা বলে শান্তি সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে ট্রাম্প প্রশাসন একটি ১৫ দফা পরিকল্পনা দিয়েছে। এই প্রস্তাবের মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে হবে। কারণ এই পথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনও বাধা মানে পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা।
দ্বিতীয়ত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। আমেরিকার মতে, এটি নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
শুনতে সহজ মনে হলেও, এই শর্তগুলো ইরানের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এতে তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
এখানেই বিষয়টা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শুধু না বলেই থেমে থাকেনি ইরান, তারা নিজেরাও কিছু শর্ত সামনে এনেছে।
প্রথম শর্ত—মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা আমেরিকার সমস্ত সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত—হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে অর্থ দিতে হবে।
ভাবো একবার, দুই পক্ষই এমন শর্ত দিচ্ছে যা অপর পক্ষের জন্য প্রায় অসম্ভব। তাই সমঝোতা হওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ইরান বারবার একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিচ্ছে—তারা কোনও চাপের কাছে মাথা নত করবে না। তাদের মতে, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের আগ্রাসনের মুখেও তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই বার্তাটা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি তাদের দেশের জনগণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তারা দেখাতে চাইছে, দেশ কোনওভাবেই দুর্বল হয়নি।
আরাঘচি আরও বলেন, আমেরিকার লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করা—কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি।
এদিকে বসে নেই আমেরিকাও। ট্রাম্প ইরানের অবস্থানকে কটাক্ষ করে বলেছেন, তেহরান আসলে যুদ্ধবিরতি চায়, কিন্তু তারা ভয় পাচ্ছে।
তার মতে, ইরান সরকার চিন্তিত—যদি তারা যুদ্ধ থামাতে চায়, তাহলে দেশের ভেতর থেকেই বিরোধিতা আসতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, সেটি এক ধরনের “সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ”।
এই ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
একটু সহজভাবে বলি—হরমুজ প্রণালী হচ্ছে এমন একটি রাস্তা, যেখান দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়।
যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায় বা সমস্যা হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি প্রভাবিত হবে। তেলের দাম বাড়বে, পরিবহন খরচ বাড়বে—সবকিছুতেই প্রভাব পড়বে।
এই কারণেই এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে এত টানাপোড়েন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এভাবে চলতে থাকলে শেষটা কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, খুব দ্রুত কোনও সমাধান আসছে না। কারণ দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে রাজি নয়।
তবে আন্তর্জাতিক মহল চাইছে, কোনওভাবে আলোচনার পথ খুলে যাক। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়বে।
পুরো ঘটনাটা দেখলে মনে হয়, এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়—এটি ক্ষমতা, প্রভাব আর নিরাপত্তার এক জটিল খেলা।
একদিকে আমেরিকা তার শর্ত চাপিয়ে দিতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান দেখাচ্ছে যে তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে আগে এক পা পিছিয়ে আসবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত, শান্তি তখনই আসবে যখন কেউ একজন বলবে, “চল, এবার বসে কথা বলি।”



