বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নিয়েছে, যখন ইরান স্পষ্টভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে। এর পরপরই তেহরানের কাছাকাছি এলাকায় প্রায় ৭,০০০ মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনাটি মূলত ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক শক্তিকে সীমিত করার দিকে কেন্দ্রিত ছিল। এই পরিকল্পনায় ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছিল।
কিন্তু ইরান এই প্রস্তাবকে সরাসরি ‘অবাস্তব’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। তেহরান জানায়, তারা কোনোভাবেই তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। বরং তারা পাল্টা দাবি তুলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়।

শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সামরিক প্রস্তুতি বাড়াতে শুরু করে। প্রায় ২,০০০ প্যারাট্রুপারকে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়, যারা ইতিমধ্যেই সেখানে থাকা ৪,৫০০ মেরিন সেনার সঙ্গে যোগ দেয়।
এই বিশাল বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট একদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখছেন, অন্যদিকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত।
শুধু শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেই থেমে থাকেনি ইরান। তারা নতুন কিছু শর্ত সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যত গ্রহণযোগ্য নয়। ইরান চায়—
- উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা
- অতীত হামলার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান
- লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করা
এছাড়া, ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চায়। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ, যেখানে দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়।
হরমুজ প্রণালী এমন একটি সংকীর্ণ জলপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তাহলে তারা জাহাজ চলাচলের ওপর কর আরোপ করতে পারবে।

এটি অনেকটা সুয়েজ খালের মতো, যেখানে মিশর জাহাজ চলাচল থেকে রাজস্ব আদায় করে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন বৈশ্বিক তেল বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে সরাসরি আন্তর্জাতিক তেল বাজারে। শান্তি পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তেলের দাম কিছুটা কমে গেলেও, ইরানের প্রত্যাখ্যানের পর তা আবার বেড়ে যায়।
একদিনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৭ ডলার থেকে বেড়ে ১০২ ডলারে পৌঁছায়। এই ওঠানামা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে, বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানিনির্ভর।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনা নেই। দুই দেশই মিশর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
এই ধরনের যোগাযোগ প্রক্রিয়া সাধারণত ধীরগতির হয় এবং ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্প এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে এই সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু ইরানের বর্তমান অবস্থান সেই সম্ভাবনাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে দৃঢ় অবস্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন দেশের ভেতর থেকেও চাপের মুখে পড়েছেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, তেলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়বে, যা সরকারকে আরও চাপে ফেলবে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাকের কালিবাফ বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে উঠে এসেছেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, তবুও আন্তর্জাতিক মহল তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে দেখছে।



