সকালে ঘুম থেকে ওঠা—এই একটা কাজ আজও অনেকের কাছে যুদ্ধের মতো। অ্যালার্ম বাজে, আমরা বন্ধ করি, আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু একটু ভাবুন তো, যখন অ্যালার্ম ঘড়ি ছিলই না, তখন মানুষ কীভাবে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠত?
শুনতে অবাক লাগলেও, এক সময় মানুষ ঘুম ভাঙানোর জন্য লোক ভাড়া করত! শুধু এটুকুই নয়, আরও অনেক অদ্ভুত আর মজার পদ্ধতি ছিল, যেগুলো আজ শুনলে গল্প মনে হয়, কিন্তু তখন ছিল বাস্তব।
চলুন ধীরে ধীরে সেই সময়টায় ঘুরে আসি।
শিল্প-বিপ্লবের সময় ব্রিটেনে এক অদ্ভুত পেশার জন্ম হয়—‘নকার আপার্স’। এদের কাজ ছিল মানুষকে ঘুম থেকে তোলা।
ভাবুন, আপনি ঘুমাচ্ছেন, আর ভোরবেলা কেউ এসে আপনার জানালায় টোকা মারছে। আপনি না ওঠা পর্যন্ত সে থামছেই না!
এরা লাঠি, লম্বা দণ্ড বা কখনো ছোট ছোট মটরশুঁটির দানা ছুঁড়ে জানালায় আঘাত করত। লক্ষ্য একটাই—আপনাকে জাগাতেই হবে।
কারখানার শ্রমিকদের জন্য এটা ছিল খুব জরুরি। কারণ তখন কাজের সময় ছিল খুব কড়া। মাত্র কয়েক মিনিট দেরি হলেই পুরো কাজ আটকে যেতে পারত। তাই সময়মতো ওঠা মানে ছিল চাকরি বাঁচানো।
মজার ব্যাপার হলো, এই ‘নকার আপার্স’রা এতটাই দায়িত্বশীল ছিল যে আপনি না ওঠা পর্যন্ত তারা যেত না। আজকের অ্যালার্মের মতো “স্নুজ” করার সুযোগ ছিল না!
এখন আমরা ঘড়ি দেখি, ফোন দেখি। কিন্তু তখন মানুষ মোমবাতি দিয়ে সময় মাপত।
এক ধরনের বিশেষ মোমবাতি ছিল, যেখানে নির্দিষ্ট দূরত্বে চিহ্ন দেওয়া থাকত। মোম গলতে গলতে প্রতি ঘণ্টায় একটা পেরেক নিচে পড়ে শব্দ করত।
ভাবুন, রাতের নীরবতায় হঠাৎ “টিং!” শব্দ হলো—এই শব্দই ছিল আপনার অ্যালার্ম!
এটা অনেকটা আজকের টাইমারের মতোই কাজ করত, শুধু একটু বেশি সৃজনশীলভাবে।
গ্রামে বড় হওয়া কেউ হলে এটা খুব পরিচিত লাগবে। ভোর হতেই মোরগ ডাকতে শুরু করে।
এক সময় মানুষ এই মোরগের ডাককেই অ্যালার্ম হিসেবে ব্যবহার করত। আসলে মোরগের নিজের শরীরের ঘড়ি থাকে, যাকে বলা হয় সার্কেডিয়ান ছন্দ। সেই অনুযায়ী তারা নির্দিষ্ট সময়েই ডাকত।
তাই অ্যালার্ম না থাকলেও, মোরগ ছিল একদম ফ্রি আর নির্ভরযোগ্য “নেচারাল অ্যালার্ম”।
মধ্যযুগে ইউরোপে গির্জা ছিল জীবনের কেন্দ্র। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টা বাজত, আর মানুষ সেই শব্দ শুনেই সময় বুঝত।
কখন কাজ শুরু হবে, কখন প্রার্থনা, কখন বিশ্রাম—সবকিছুই এই ঘণ্টার ওপর নির্ভর করত।
অনেক বাড়িতেও ছোট ঘণ্টা থাকত। আবার কাজের লোকেরা আগে উঠে মালিকদের জাগিয়ে দিত।
একভাবে ভাবলে, তখনকার সমাজটাই যেন একটা বড় “লাইভ অ্যালার্ম সিস্টেম” ছিল।
শুনতে অবাক লাগলেও, অ্যালার্ম ঘড়ির ধারণা একেবারে নতুন নয়। প্রাচীন যুগেও এর বিভিন্ন রূপ ছিল।
প্রাচীন গ্রিসে জল-ঘড়ি ব্যবহার করা হতো। পানি ধীরে ধীরে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে যেত। নির্দিষ্ট সময় হলে চাপ তৈরি হয়ে হুইসেলের মতো শব্দ হতো—মানে, ওঠার সময়!
চীনে ধূপ বা আগরবাতি দিয়ে সময় মাপা হতো। কখনো ধাতব বল ঝুলিয়ে রাখা হতো, যা নির্দিষ্ট সময়ে পড়ে শব্দ করত।
আরও মজার একটা পদ্ধতি ছিল—কেউ কেউ নিজের পায়ের আঙুলে ধূপকাঠি গুঁজে রাখত। ধীরে ধীরে জ্বলতে জ্বলতে সেটা গায়ে লাগলে ঘুম ভেঙে যেত!
ভাবুন তো, অ্যালার্মের জন্য এমন “জ্বালাময়ী” পদ্ধতি!
এই পেশাটা শুধু মানুষকে জাগানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক সময় তারা মানুষের জীবনও বাঁচিয়েছে।
এক ঘটনায় দেখা যায়, একজন ‘নকার আপার’ রাতের বেলা আগুন দেখে ঘুমন্ত পরিবারকে জাগিয়ে জীবন বাঁচান।
আবার আরেকজন একটি খুনের ঘটনার প্রথম সাক্ষী হন।
মানে, তারা ছিল একসঙ্গে অ্যালার্ম, নিরাপত্তারক্ষী আর সমাজের নজরদার।
সময় বদলাতে শুরু করল। ধীরে ধীরে অ্যালার্ম ঘড়ি সস্তা আর সহজলভ্য হয়ে উঠল।
বিশেষ করে উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে, প্রায় সবাই নিজের অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে।
তখন আর কাউকে টাকা দিয়ে ডেকে ঘুম ভাঙানোর দরকার পড়ল না। ‘নকার আপার্স’ পেশাও ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে গেল।
একটা জিনিস কিন্তু আমরা এখান থেকে শিখতে পারি।
আগে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে চলত। সূর্যের আলো, অন্ধকার—এসবই তাদের ঘুম আর জাগার সময় ঠিক করত।
আজ আমরা রাত জেগে ফোন দেখি, লাইট জ্বালিয়ে রাখি। এতে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়।
গবেষণা বলছে, সকালে সূর্যের আলো শরীরের জন্য খুব ভালো। এটা ঘুমের রুটিন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
আর রাতের কৃত্রিম আলো কমালে ঘুমও ভালো হয়।
আগে মানুষ নিয়ম মেনে চলত। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাত, নির্দিষ্ট সময়ে উঠত।
এই অভ্যাসের একটা মজার দিক হলো—কিছুদিন পর অ্যালার্ম ছাড়াই একই সময়ে ঘুম ভাঙে!
এটা ঠিক যেমন, আপনি যদি প্রতিদিন একই সময়ে খেতে বসেন, তখন নিজে থেকেই সেই সময় ক্ষুধা লাগে।
ঘুমের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ব্যাপার।
আজ আমরা অ্যালার্ম ঘড়ি, মোবাইল—সবকিছু পেয়েছি। কিন্তু আগে মানুষ যে কত সৃজনশীলভাবে সমস্যার সমাধান করত, সেটা ভাবলেই অবাক লাগে।
লোক ভাড়া করে ঘুম ভাঙানো, মোমবাতি দিয়ে সময় মাপা, মোরগের ডাক—সবই ছিল তাদের জীবনের অংশ।
একভাবে দেখলে, তখনকার মানুষ একটু বেশি প্রকৃতির কাছাকাছি ছিল। আর হয়তো সেই কারণেই তাদের জীবন ছিল একটু বেশি ছন্দময়।
তাই আজও যদি ভালো ঘুম আর ভালো সকাল চান, খুব কঠিন কিছু না—একটু নিয়ম, একটু আলো, আর একটু সচেতনতা—এই তিনটাই যথেষ্ট।



