১৯৭১ সাল। বাঙালির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। চারদিকে যুদ্ধ, ভয়, অনিশ্চয়তা। এর মাঝেই চলে আসে ঈদুল ফিতর—কিন্তু সেই ঈদ ছিল না আনন্দের, ছিল না হাসি-খুশির। বরং ছিল দুঃখ, শূন্যতা আর অপেক্ষার এক নিঃশব্দ দিন।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বাশার খান যেমন বলেছেন, এমন নিরানন্দ ঈদ বাঙালির জীবনে আর আসেনি। সত্যিই, সেই সময় ঈদ মানে ছিল শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন—মন থেকে কেউ তা উদযাপন করতে পারেনি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম হামলা, গ্রাম পোড়ানো, মানুষ হত্যা—সব মিলিয়ে পুরো দেশ তখন আতঙ্কে ডুবে। মানুষ প্রতিদিন বাঁচার লড়াই করছিল। ঠিক এই সময়েই আসে ঈদ।
পাকিস্তানি সরকার তাদের সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে বেতন-ভাতা বাড়ায়, এমনকি রাজাকার-আলবদরদেরও বিশেষ সুবিধা দেয়। তাদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজনও ছিল।

কিন্তু সাধারণ মানুষ? তাদের কাছে ঈদ মানে ছিল না নতুন জামা, না সেমাই—বরং ছিল ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকা।
ঢাকা তখন একপ্রকার বন্দী শহর। চারদিকে সেনাবাহিনীর টহল, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। ঈদের সকালেও সেই একই চিত্র।
জেবুননেছা জুবি তার স্মৃতিতে লিখেছেন, ভোরে ঘুম ভেঙেছিল কামানের শব্দে। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো ঈদের সংকেত, কিন্তু পরে বোঝা গেল—এটা যুদ্ধেরই অংশ।
জাহানারা ইমাম তার বিখ্যাত ডায়েরি একাত্তরের দিনগুলি-তে লিখেছেন, তাদের বাসায় ঈদের কোনো আয়োজনই ছিল না। নতুন কাপড় নেই, ঘর পরিষ্কার হয়নি, এমনকি পরিবারের অনেকেই ঈদের নামাজেও যাননি।
তবু তিনি রান্না করেছিলেন সেমাই, পোলাও, কোরমা—একটা আশায়। যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা হঠাৎ এসে পড়ে, তাহলে যেন তাকে খাওয়ানো যায়। ভাবো একবার—নিজের ছেলের মতো ছেলেরা যুদ্ধ করছে, তাদের জন্য মা হয়ে অপেক্ষা করছেন।
ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছিলেন, শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ তখন অনেক বেশি কষ্টে ছিল।
অনেক জায়গায় ঈদের নামাজই হয়নি। যারা পড়েছে, তারাও দ্রুত বাসায় ফিরে এসেছে—কেউ নিরাপদ বোধ করছিল না।
একজন বৃদ্ধা তাহমিনা বেগমের কথাই ধরো—তিনি বলেছিলেন, সেই ঈদে তারা ভালো কিছু রান্না করতে পারেননি। ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড় কেনার প্রশ্নই ওঠেনি। পুরোনো কাপড়েই ঈদ কেটেছে।
যারা যুদ্ধ করছিলেন, তাদের কাছে ঈদ ছিল প্রায় ভুলে যাওয়া একটি দিন।
অনেক জায়গায় ঈদের আগের রাতেও যুদ্ধ হয়েছে। এমনকি ঈদের দিনেও কুষ্টিয়া, শেরপুর, আখাউড়ায় যুদ্ধ চলেছে।
কিছু ক্যাম্পে নামাজের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু ভয় ছিল—নামাজের মাঝেই হামলা হতে পারে। তাই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত—মুসলিম মুক্তিযোদ্ধারা নামাজ পড়ছেন, আর হিন্দু সহযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন।
মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম তার স্মৃতিতে এই দৃশ্য তুলে ধরেছেন। এটা শুধু যুদ্ধ না, একতা আর বিশ্বাসেরও গল্প।
খাবারের কথা বললে—সেমাই ছিল, কখনো একটু মাংসও জুটেছে। কিন্তু অনেক সময় মুক্তিযোদ্ধারা খেতে বসে জানতে পেরেছেন, আজ ঈদ!
অজয় দাশগুপ্ত লিখেছেন, এক টুকরো মাংস পেয়ে কেউ কেউ খেতে খেতেই কেঁদে ফেলেছিলেন—কারণ তাদের মনে পড়ে গেছে বাড়ির কথা।
তখন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ছিল ভারতের কলকাতায়। সেখানেও ঈদ হয়েছিল, কিন্তু খুবই সাদামাটা।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এবং সেনাপ্রধান এমএজি ওসমানী একসঙ্গে নামাজ পড়েছিলেন।
নামাজ শেষে কোলাকুলি হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে—কিন্তু খাবারের কোনো বিশেষ আয়োজন ছিল না।
নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেই ঈদ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নিরানন্দ ঈদ।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঈদের নামাজ শেষে বলেছিলেন—“আগামী ঈদ আমরা বাংলাদেশে করব।”
এই কথাটা শুধু একটা বাক্য ছিল না। এটা ছিল আশা, সাহস আর বিশ্বাসের প্রতীক।
তাজউদ্দীন আহমদের নিজের পরিবারেও ঈদের কোনো বিশেষ আয়োজন ছিল না। তার মেয়ে শারমিন আহমদ লিখেছেন, তারা শাক-ডাল-ভাত খেয়েই ঈদ করেছেন।
তাজউদ্দীন নিজেও সেদিন ঠিকমতো খাননি। বরং তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করতে চলে যান। তাদের জন্য নিয়ে যাওয়া খাবারই তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেন।
ভাবো তো—নিজের ঈদের চেয়ে দেশের জন্য লড়াই করা মানুষদের তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রায় এক কোটি মানুষ তখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরে জীবন ছিল খুবই কষ্টের।
খাবার কম, থাকার জায়গা অপ্রতুল—এর মাঝেই ঈদ আসে।

বেগম মুশতারি শফি তার স্মৃতিতে লিখেছেন, তার বাচ্চারা অন্যদের নতুন কাপড় দেখে প্রশ্ন করেছিল—“আমরা কি ঈদ করব না?”
এই প্রশ্নটা খুব ছোট, কিন্তু এর ভেতরে কত বড় কষ্ট লুকানো!
ঈদের খাবার বলতে শুধু একটু সেমাই। না পোলাও, না মাংস—কিছুই ছিল না।
রাতের দিকে শরণার্থী শিবিরে শুধু মানুষের কান্না আর শিশুদের চিৎকার শোনা যেত। সেখানে ঈদের আনন্দ পৌঁছাতে পারেনি।
একাত্তরের ঈদ ছিল না আনন্দের, ছিল না উৎসবের। কিন্তু এর ভেতরে ছিল এক অন্যরকম শক্তি—স্বাধীনতার স্বপ্ন।
মানুষ নতুন কাপড় পায়নি, ভালো খাবার পায়নি, পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল। তবু তারা হাল ছাড়েনি।
কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল—এই কষ্ট একদিন শেষ হবে, দেশ স্বাধীন হবে, আর একদিন সত্যিকারের ঈদ আসবে।
আর সত্যিই, সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল।
আজ আমরা যখন ঈদে আনন্দ করি, নতুন কাপড় পরি, পরিবার নিয়ে খাই—তখন একটু হলেও মনে রাখা উচিত, এক সময় এই ঈদই ছিল চোখের জলের গল্প।



