ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফেরা। শহরের ব্যস্ততা, কাজের চাপ—সবকিছু ছাপিয়ে এই সময়টাতে সবার একটাই ইচ্ছে, প্রিয়জনদের পাশে থাকা। তাই পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে শেষ মুহূর্তেও রাজধানী ঢাকা ছাড়ছেন হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ। কেউ ট্রেনে, কেউ বাসে, আবার কেউ নদীপথে লঞ্চে করে ছুটছেন গ্রামের বাড়ির দিকে।
এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ না—এটা যেন এক ধরনের আবেগের গল্প। বছরের পর বছর একই দৃশ্য, কিন্তু অনুভূতিটা কখনোই পুরোনো হয় না।
শুক্রবার (২০ মার্চ) ভোর থেকেই রেল, সড়ক ও নৌপথে যাত্রীদের চলাচল শুরু হয়। তবে আগের কয়েক দিনের তুলনায় আজ যাত্রীদের চাপ কিছুটা কম দেখা গেছে। অনেকেই আগেভাগেই রওনা হয়ে যাওয়ায় শেষ দিনের ভিড় তুলনামূলক কম।
যদিও ভিড় কম, তবুও মানুষের চোখেমুখে ছিল তাড়াহুড়া আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি। কেউ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দ্রুত হাঁটছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের ফোনে বলছেন—“আর একটু পরেই পৌঁছে যাব।”
রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, আগের দিনের তুলনায় এখানে যাত্রীচাপ অনেকটাই কম। প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভিড় থাকলেও সেটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।
কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্দুর প্রভাতী ট্রেনের এক যাত্রী আতাউর রহমান, যিনি পেশায় সবজি বিক্রেতা, বেশ স্বস্তির কথাই বললেন। তিনি জানান, তিন দিন আগে আনা সবজি আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে। এখন ঈদে বাড়ি যাওয়ার পালা।
তার কথায় একটা আলাদা আনন্দ ছিল—“ট্রেন অনেকটাই ফাঁকা, কোনো ভোগান্তি নেই। আরামে বসে যেতে পারছি।”
এই কথাটা অনেকেরই মনের কথা। কারণ, সাধারণত ঈদের আগে ট্রেনযাত্রা মানেই ঠাসাঠাসি ভিড়, দাড়িয়ে যাওয়া, আর অনিশ্চয়তা। কিন্তু এবার শেষ দিনে সেই চাপ কিছুটা কম।
শুধু রেল নয়, রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল-এও একই চিত্র দেখা গেছে। যাত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও সেটা আগের দিনের মতো তীব্র ছিল না।
বাস কাউন্টারগুলোতে লম্বা লাইন কম, টিকিট পাওয়া তুলনামূলক সহজ। অনেক যাত্রীই বলছিলেন, “ভাবছিলাম আজকে খুব কষ্ট হবে, কিন্তু তেমন সমস্যা হয়নি।”
সড়কেও গাড়ির চাপ কম ছিল। ফলে যানজটের ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। যারা শেষ মুহূর্তে রওনা হয়েছেন, তাদের জন্য এটা বড় স্বস্তির খবর।
বাংলাদেশে নদীপথে যাত্রা অনেকের জন্য এখনো খুব জনপ্রিয়। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের জন্য লঞ্চই প্রধান ভরসা।
এই ঈদে লঞ্চঘাটগুলোতেও যাত্রীদের চাপ থাকলেও সেটা আগের তুলনায় কম। যারা আগেভাগে টিকিট কেটে রেখেছেন, তারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রা করতে পেরেছেন।
নদীর উপর দিয়ে ভেসে চলা লঞ্চে বসে অনেকে আগেই ঈদের আনন্দ অনুভব করতে শুরু করেছেন—একটু হাওয়া, একটু গল্প, আর সামনে পরিবারের সঙ্গে দেখা হওয়ার উত্তেজনা।
এবারের ঈদযাত্রায় একটা বিষয় চোখে পড়ার মতো—শেষ দিনের ভিড় কম। এর পেছনে কয়েকটা কারণ আছে।
প্রথমত, অনেক মানুষ আগেই পরিকল্পনা করে যাত্রা শুরু করেছেন। আগের বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝেছেন, শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়াতে হলে আগে বের হওয়াই ভালো।
দ্বিতীয়ত, এবার ছুটির সময় কিছুটা দীর্ঘ হওয়ায় মানুষ ধীরে-সুস্থে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
আরেকটা বিষয় হলো, অনলাইন টিকিট ব্যবস্থা অনেকটা সহজ হওয়ায় যাত্রা পরিকল্পনা করা এখন আগের চেয়ে সহজ।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে ২০ মার্চ শুক্রবার রমজান মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয়।
এর ফলে শনিবার (২১ মার্চ) থেকে শাওয়াল মাস শুরু হয় এবং এই দিনেই সারাদেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর।
এই খবর শোনার পর থেকেই মানুষের মধ্যে বাড়ি ফেরার তাড়া আরও বেড়ে যায়। কারণ, ঈদের নামাজ, সেমাই, আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—এসব কিছুই তো এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে।
একটা বিষয় খেয়াল করলে বুঝবেন—এই যাত্রাটা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া না। এটা আসলে একটা আবেগের ভ্রমণ।
একজন কর্মজীবী মানুষ সারাবছর শহরে কাজ করেন। ছোট্ট একটা রুমে থাকেন, পরিবার থেকে দূরে। কিন্তু ঈদের সময় তিনি সব কিছু ভুলে শুধু একটা জিনিসই ভাবেন—“বাড়ি ফিরতে হবে।”
এই অনুভূতিটা বোঝানো কঠিন, কিন্তু দেখা যায় খুব সহজে। বাসের সিটে বসে থাকা সেই মানুষটার চোখে, ট্রেনের জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা সেই ছেলেটার মুখে—সব জায়গায় একই গল্প।



