কলকাতা শহরকে আমরা আজ যেভাবে দেখি, সেটা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। এই শহর অনেক সময়, অনেক গল্প আর অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের জায়গায় এসেছে। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থার কথা বললে, সেটা যেন এক আলাদা ইতিহাস। হাতির পিঠ থেকে শুরু করে ঘোড়ার গাড়ি—সব মিলিয়ে কলকাতার রাস্তাগুলো একসময় ছিল একেবারে অন্যরকম।
চল, একটু সহজ করে সেই গল্পটা শোনা যাক।
১৯৮১ সালের কথা ভাবো। তখন কলকাতা শহরে বিশাল কাজ চলছে। এখানে রাস্তা বন্ধ, সেখানে মাটি খোঁড়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। ক্রেন, ড্রেজার, ড্রিলিং মেশিন—দিন-রাত কাজ চলছে। কারণ? শহরের বুকে তৈরি হচ্ছে পাতাল রেল।
আজকে মেট্রোতে চড়ে আমরা সহজে যাতায়াত করি, কিন্তু তখন এটা ছিল এক বড় স্বপ্ন।
শুনতে অবাক লাগলেও, একসময় কলকাতার রাস্তায় হাতি চলত! হ্যাঁ, হাতিই ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ যান।
১৭৯৫ সালের একটা খবর থেকে জানা যায়, একদিন এক ইংরেজ পরিবার ঘোড়ার গাড়িতে ফিরছিল। হঠাৎ সামনে একটা হাতি পড়ে যায়। এতে ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করে। শেষমেশ গাড়িটা উল্টে যায় নর্দমায়!
এই ঘটনাটা বুঝিয়ে দেয়—তখন রাস্তায় হাতি আর ঘোড়ার গাড়ি একসাথেই চলত।
১৮০০ সালের দিকে কলকাতার প্রধান যান ছিল পালকি। কিন্তু এখানে একটা অন্যায় নিয়ম ছিল।
শুধু সাহেবরা (ইংরেজরা) পালকিতে চড়তে পারত। স্থানীয় মানুষদের (নেটিভ) সেই অধিকার ছিল না। তারা শুধু পালকি বহন করত।
ভাবতে পারো? একজন মানুষ অন্য মানুষকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নিজে উঠতে পারছে না!
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একদিন প্রতিবাদ হলো।
১৮২৭ সালে পালকি বাহকদের বলা হলো, তাদের বিশেষ তকমা পরতে হবে। এটা অপমানজনক মনে করে তারা ধর্মঘটে যায়।
পুরো কলকাতা থমকে যায়। একটাও পালকি চলে না। সাহেবরা বিপদে পড়ে যায়—কিভাবে বের হবে তারা?
এই ঘটনাটাই ছিল কলকাতার প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট।
এই সমস্যার মধ্যেই এক ইংরেজ—ব্রাউন লো—একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে আসেন।
তিনি একটা পালকির নিচে চাকা লাগান, আর সামনে একটা ঘোড়া জুড়ে দেন। ব্যস! তৈরি হয়ে গেল ঘোড়ার গাড়ি।
প্রথম দিকের এই গাড়ির নাম ছিল “ব্রাউন বেরি”।
এটা ছিল আসলে আধুনিক গাড়ির শুরুর গল্প।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে কলকাতায় ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয় কোচ বানানোর কারখানা। বিশেষ করে ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট আর চাঁদনি এলাকায় এসব কারখানা গড়ে ওঠে।
এছাড়া তৈরি হয় ঘোড়ার আস্তাবল আর জল খাওয়ার জন্য লোহার ট্যাঙ্ক।
তখনকার বিখ্যাত কোচমেকারদের মধ্যে ছিল—চ্যান্ডলার, গ্রেঞ্জ, স্টুয়ার্ট, ওয়াটসন।
তখনকার দিনে ঘোড়ার গাড়ির নামগুলো ছিল বেশ মজার। যেমন—
জুড়ি, ল্যান্ডো, ফিটন, ব্রুহাম, বগি, ডাক গাড়ি, ব্রাউন বেরি ইত্যাদি।
এই নামগুলো আসলে গাড়ির গঠন আর ঘোড়ার সংখ্যার ওপর নির্ভর করত।
ধরো—
এক জোড়া ঘোড়া থাকলে সেটা “জুড়ি”
দুই জোড়া হলে “চৌঘুড়ি”
আর চার জোড়া হলে “আটঘুড়ি”
এগুলো শুনলে মনে হয় যেন একটা আলাদা জগৎ!
সব ঘোড়ার গাড়ি কিন্তু সবার জন্য ছিল না।
ল্যান্ডো বা ব্রুহাম—এই ধরনের গাড়ি শুধু ধনী লোকেরা ব্যবহার করত। এগুলো ভাড়া পাওয়া যেত না।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য ছিল কেরাঞ্চি, পালকি গাড়ি, ছক্কোড় ইত্যাদি।
কেরাঞ্চি ছিল অনেকটা আজকের শেয়ার ট্যাক্সির মতো। একসাথে অনেক লোক উঠত।
তখন ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করাও সহজ ছিল না।
একজোড়া ঘোড়া দৈনিক ভাড়া ছিল প্রায় ১০ টাকা। মাসে নিলে প্রায় ১৫০ টাকা।
আর গাড়ি সহ ভাড়া নিলে খরচ আরও বেশি।
এখন শুনতে কম মনে হলেও, তখন এটা ছিল অনেক বড় টাকা।
১৮৪৩ সালের হিসাব বলছে—
একটা বগি গাড়ির দাম ছিল ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা।
পালকি গাড়ির দাম ছিল ৯০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
আর ঘোড়ার দাম?
৫০০ টাকার নিচে ভালো ঘোড়া পাওয়া যেত না।
মানে, ঘোড়ার গাড়ি রাখা ছিল একদম স্ট্যাটাসের ব্যাপার।
সব মিলিয়ে দেখো, কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থা একদম বদলে গেছে সময়ের সাথে।
হাতি থেকে পালকি, পালকি থেকে ঘোড়ার গাড়ি, আর এখন মেট্রো—এই পুরো যাত্রাটা আসলে একটা শহরের বড় হয়ে ওঠার গল্প।
আজ আমরা যখন রাস্তায় গাড়ি দেখি, তখন হয়তো ভাবিই না—এই জায়গায় একসময় হাতি হেঁটেছে, পালকি চলেছে, আর ঘোড়ার গাড়ি ছিল রাজা!
ইতিহাসটা জানলে শহরটাকে একটু অন্য চোখে দেখা যায়, তাই না?
লেখক: রিফাত-বিন-ত্বহা।


