ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় উৎসব বলা হয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলকে। প্রতি বছর কোটি কোটি দর্শক এই টুর্নামেন্ট ঘিরে অপেক্ষা করে থাকে। কিন্তু এবার সেই মহা আয়োজনের শুরুতেই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তার মেঘ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আইপিএলের শুরুতেই বিদেশি ক্রিকেটারদের পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বের সূচি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে, তবুও ঠিক সময়মতো আইপিএল শুরু হবে কি না—সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। যুদ্ধের প্রভাব কেবল রাজনীতি বা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তার সরাসরি ছাপ পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত এখন বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বড়ভাবে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। দুবাই ও দোহার মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এই দুই শহর আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভারত যাওয়ার সময় অসংখ্য ক্রিকেটার ও যাত্রী সাধারণত এই বিমানবন্দরগুলোকেই ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা রুট পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এর ফলে আইপিএলে অংশ নেওয়া অনেক বিদেশি ক্রিকেটারের যাতায়াত পরিকল্পনাও ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুর্নামেন্ট সময়মতো শুরু হলেও প্রথম কয়েকটি ম্যাচে সব বিদেশি ক্রিকেটারকে পাওয়া নাও যেতে পারে। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক ক্রিকেটার এখনও নিজেদের দেশে আটকে রয়েছেন।
সাধারণত এই দেশগুলোর ক্রিকেটাররা ভারতে আসার সময় দুবাই বা দোহার মাধ্যমে ট্রানজিট নেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পথ পুরোপুরি নিরাপদ বা স্বাভাবিক নয়। ফলে তারা কবে দেশে ফিরবেন এবং তারপর কবে আইপিএলে যোগ দিতে পারবেন—তা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এখনও আইপিএল শুরু হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় বাকি আছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সময়ের মধ্যে সব বিদেশি ক্রিকেটারের ভারতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আইপিএলের প্রায় প্রতিটি দলেই একাধিক বিদেশি ক্রিকেটার থাকে। কিন্তু সব দলের সমস্যা সমান হবে না। যেসব দলে দক্ষিণ আফ্রিকা বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার বেশি রয়েছে, সেই দলগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে পড়তে পারে।
ধরা যাক, কোনো দলের মূল ফাস্ট বোলার বা গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার যদি বিদেশি হয় এবং সে সময়মতো না আসে, তাহলে দলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। টুর্নামেন্টের শুরুতেই এর প্রভাব ম্যাচের ফলাফলেও পড়তে পারে।
অনেক দলই তাদের কৌশল সাজায় বিদেশি তারকাদের ঘিরে। ফলে তাদের অনুপস্থিতি শুধু একাদশের সমস্যা নয়, পুরো পরিকল্পনাকেই বদলে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কেবল বিমান চলাচলেই সমস্যা তৈরি করেনি, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়েছে, গ্যাস সরবরাহেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
ভারতও এর বাইরে নয়। দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি আইন ‘এসমা’ জারি করেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে আইপিএলের মতো বিশাল আয়োজন পরিচালনা করা কতটা সহজ হবে, সেটাও এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ আইপিএল আয়োজন মানেই বড় পরিসরের ভ্রমণ, আলো, সম্প্রচার এবং অসংখ্য লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা—যার সবকিছুতেই জ্বালানি প্রয়োজন।
ক্রিকেট বোর্ড এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে, যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে আইপিএল পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
কারণ বোর্ড চায় টুর্নামেন্ট শুরু হোক পূর্ণ শক্তির দলগুলো নিয়ে। বিদেশি তারকারা না থাকলে আইপিএলের আকর্ষণ অনেকটাই কমে যেতে পারে। দর্শকরাও তখন সেই উত্তেজনা অনুভব করতে পারবেন না।
তবে আইপিএল সম্পূর্ণ বাতিল করার চিন্তা আপাতত বোর্ডের মাথায় নেই বলেই জানা যাচ্ছে। পরিস্থিতি যতটা সম্ভব সামাল দিয়ে টুর্নামেন্ট আয়োজনের পথই খুঁজছে আয়োজকরা।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আইপিএল শুধু একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়। এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ইভেন্টও বটে। স্পনসরশিপ, সম্প্রচার অধিকার, পর্যটন—সব মিলিয়ে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার কোটি টাকার লেনদেন।
এই কারণেই বোর্ড চাইবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে, যাতে নির্ধারিত সময়েই টুর্নামেন্ট শুরু করা যায়। যদি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয় এবং বিমান চলাচল আবার ঠিকঠাক শুরু হয়, তাহলে বিদেশি ক্রিকেটাররাও দ্রুত ভারতে পৌঁছে যেতে পারবেন।
ক্রিকেটপ্রেমীরাও এখন সেই আশাতেই অপেক্ষা করছেন। কারণ আইপিএল মানেই চার-ছক্কার ঝড়, স্টেডিয়ামে দর্শকদের উল্লাস আর টানা কয়েক সপ্তাহের ক্রিকেট উৎসব।
সবকিছু এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর। যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি দ্রুত শান্ত হয়, তাহলে আইপিএলের সূচিতে খুব বেশি পরিবর্তন নাও আসতে পারে। কিন্তু যদি অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আয়োজকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
একদিকে ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বোর্ডকে।
এখন পর্যন্ত আইপিএল বাতিলের কোনো ঘোষণা নেই। বরং আয়োজকরা চাইছেন পরিস্থিতি সামলে টুর্নামেন্ট শুরু করতে। তবে যুদ্ধের ছায়া যে এবার আইপিএলের ওপরও পড়েছে, সেটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
ক্রিকেট বিশ্বের নজর তাই এখন একটাই প্রশ্নে—সব বাধা পেরিয়ে কি সময়মতো শুরু হবে আইপিএল, নাকি যুদ্ধের প্রভাবেই পিছিয়ে যাবে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় টি–টোয়েন্টি লিগ? সময়ই দেবে সেই উত্তর।

