মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে এর প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই মূলত বাজারে এই অস্থিরতার প্রধান কারণ।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই লাফিয়ে উঠেছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৯২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জ্বালানি বাজারের জন্য বড় একটি ধাক্কা।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এই বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব অনুভব করছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্যের দাম পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এটি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হলো পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। কিন্তু চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ফলে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাজারে যখনই সরবরাহ কমার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখনই দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ঠিক এমনটাই এখন ঘটছে। অনেক জাহাজ কোম্পানি নিরাপত্তাজনিত কারণে এই পথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এতে পরিবহন খরচও বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। মার্কিন ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। কিছু ক্ষেত্রে দাম প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এই দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম বড় কেন্দ্র। এই অঞ্চলে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি বাজারে দাম বাড়লেও শেয়ারবাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। অনেক বাজারে গত ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ঝুঁকি কমাতে শেয়ার বিক্রি করে দেন। ফলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং সূচক নিচের দিকে নামতে থাকে। বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন, যেমন স্বর্ণ বা ডলার।
জ্বালানির দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর। কারণ প্রায় সব শিল্প খাতেই জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর যদি জ্বালানি ব্যয় আবার বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করতে হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই কারণেই বর্তমানে মার্কিন ডলার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিপরীতে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মান কিছুটা কমে গেছে।
ডলার শক্তিশালী হলে অনেক দেশের জন্য আমদানি ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এতে বেশি চাপের মুখে পড়ে। কারণ তাদের বেশিরভাগ জ্বালানি ও পণ্য ডলারে কিনতে হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির এই অস্থিরতা শুধু বড় কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বাড়ে, বিদ্যুতের খরচ বাড়ে, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উৎপাদন খরচ বাড়লে অনেক সময় পণ্যের দাম বাড়াতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার, শেয়ারবাজার—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যদি দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক দেশকে তখন নতুন অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইস্যু নয়। এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির বড় এক সংকটে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব অনুভব করবে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ।
Discover more from Jashore Khabor
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

