পশ্চিম এশিয়ার চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েল অভিযোগ তুলেছে, ইরান নাকি তাদের বিরুদ্ধে হামলায় ভয়ংকর ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এই ধরনের বোমা যুক্ত করে ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানা হচ্ছে।
তবে ইরান এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কিন্তু বিষয়টি সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—আসলে ক্লাস্টার বোমা কী, কেন এটিকে এত ভয়ংকর বলা হয়, এবং কেন এই অস্ত্র নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত বিতর্ক।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আন্তর্জাতিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোসানি দাবি করেছেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ক্লাস্টার বোমা যুক্ত করে হামলা চালাচ্ছে। তাঁর কথায়, এই হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে জনবসতিপূর্ণ এলাকাও।
তিনি বলেন, “সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এমন কাজ যুদ্ধাপরাধের শামিল।”
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারে ইরানকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে কিছু শক্তিশালী দেশ। যদিও এই বিষয়ে অভিযুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, বর্তমান পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে এই প্রথম ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের অভিযোগ উঠল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে।
কারণ, এই অস্ত্রকে অনেক দেশই অত্যন্ত বিতর্কিত এবং মানবিক দিক থেকে বিপজ্জনক বলে মনে করে। তাই বিশ্বের বহু দেশ ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নামটা শুনলে হয়তো একটু জটিল মনে হয়, কিন্তু ধারণাটা সহজ। ইংরেজি “Cluster” শব্দের অর্থ একগুচ্ছ বা অনেকগুলো জিনিস একসঙ্গে থাকা।
ক্লাস্টার বোমার ভেতরে আসলে থাকে অনেক ছোট ছোট বোমা। বাইরে থেকে এটি দেখতে একটি বড় বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। কিন্তু সেটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর মাঝ আকাশেই খুলে যায়। তখন ভেতরে থাকা ছোট বোমাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাবুন, আপনি যদি একটি বড় আতশবাজি আকাশে ছুড়েন আর সেটা হঠাৎ খুলে গিয়ে চারদিকে অনেক ছোট ছোট আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেয়—ক্লাস্টার বোমার ধারণাটাও অনেকটা সেরকম।
তবে পার্থক্য হলো, এই ছোট বোমাগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষতি করতে সক্ষম।
ক্লাস্টার বোমাকে ভয়ংকর বলা হয় মূলত দুটি কারণে।
প্রথম কারণ হলো এর বিস্তৃত আঘাত ক্ষমতা। একটি মাত্র বোমা বিস্ফোরিত হলে এক জায়গায় ক্ষতি হয়। কিন্তু ক্লাস্টার বোমা একসঙ্গে অনেক ছোট বোমা ছড়িয়ে দেয়। ফলে বড় এলাকায় একসঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রাণহানি ও ধ্বংসের পরিমাণ অনেক বেশি হয়।
দ্বিতীয় কারণটি আরও বিপজ্জনক। সব ছোট বোমা সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয় না। অনেক সময় কিছু বোমা মাটিতে পড়ে অক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরে কেউ অসাবধানতাবশত কাছে গেলে বা স্পর্শ করলে তখন বিস্ফোরণ ঘটে।
এই কারণে যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও সাধারণ মানুষ এই বোমার কারণে হতাহত হতে পারে।
ক্লাস্টার বোমা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিতর্ক রয়েছে। অনেক মানবাধিকার সংগঠন মনে করে, এই অস্ত্র নির্বিচারে ক্ষতি করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে।
এই কারণেই বহু দেশ ক্লাস্টার বোমা নিষিদ্ধ করার পক্ষে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। সেই চুক্তির লক্ষ্য ছিল—যুদ্ধক্ষেত্রেও যেন এমন অস্ত্র ব্যবহার না করা হয় যা নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বাড়িয়ে দেয়।
ক্লাস্টার বোমা নতুন কোনও অস্ত্র নয়। অতীতের অনেক যুদ্ধে এর ব্যবহার দেখা গেছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এই অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে। আবার রাশিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইউক্রেনকেও এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করার অভিযোগ করা হয়।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ক্লাস্টার বোমা সরবরাহ করার অভিযোগও সামনে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি করে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অনেক অস্ত্র মূলত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য তৈরি। কিন্তু ক্লাস্টার বোমার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো—এটি ছড়িয়ে পড়ে বড় এলাকায়।
ফলে কোনও সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি কাছাকাছি বসবাসকারী সাধারণ মানুষের বাড়িঘরও এর আঘাতে ধ্বংস হতে পারে।
আর যে ছোট বোমাগুলো বিস্ফোরিত হয় না, সেগুলো অনেক সময় খেলনার মতো দেখতে হয়। ফলে শিশুরা কৌতূহলবশত এগুলোর কাছে গেলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মধ্যে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে সামরিক সংঘাত বাড়ছে, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যিই এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে ওই অঞ্চলের মানুষের ওপর পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল পুরো বিষয়টি নজরে রাখছে। বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থা চাইছে সংঘাত যেন আর না বাড়ে এবং সাধারণ মানুষ যেন এই ধরনের অস্ত্রের শিকার না হয়।
যুদ্ধের সময় অনেক খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, আবার অনেক অভিযোগও ওঠে। তাই সত্যতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্লাস্টার বোমা শুধু যুদ্ধের অস্ত্র নয়, এটি এমন এক অস্ত্র যার প্রভাব অনেক সময় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মানুষের জীবনে ভয়াবহ ক্ষত তৈরি করে। তাই এই অস্ত্রকে ঘিরে বিতর্ক থামার কোনও লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

