Homeবিশেষ প্রতিবেদননেপালে জোড়া ব্যালটে ভোট! কেপি ওলি বনাম বলেন্দ্র শাহ – কে হচ্ছেন...

নেপালে জোড়া ব্যালটে ভোট! কেপি ওলি বনাম বলেন্দ্র শাহ – কে হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী?

Share

হিমালয়ের কোল ঘেঁষে থাকা দেশ নেপাল আবারও বড় এক রাজনৈতিক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। এই ভোটে নির্ধারিত হবে কে গড়বে আগামী সরকার, আর কে বসবেন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন জ়ি ভোটারদের ভূমিকা এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।

নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস–এর মোট ২৭৫টি আসনের জন্য ভোট হবে। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোট বা ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। বাকি ১১০টি আসনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে সদস্য বাছাই করা হবে।

সোজা করে বললে, প্রথম পদ্ধতিতে যে প্রার্থী একটি আসনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনিই জিতবেন। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কোনও দল মোট কত শতাংশ ভোট পেল, সেই হিসেবে তারা আসন পাবে। এই দুই পদ্ধতি মিলিয়েই নেপালের মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থা।

সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। মোট ভোটার প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি। প্রার্থীর সংখ্যা ৬৫৪১ জন। তার মধ্যে ৪০ বছরের নিচে প্রার্থী এক হাজারেরও বেশি। বুথ রয়েছে প্রায় ২৩ হাজার।

২০১৫ সালের সংবিধান অনুযায়ী নেপালে এই দ্বৈত পদ্ধতি চালু হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বড় দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দলগুলোকেও সংসদে জায়গা দেওয়া। যেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।

এই ব্যবস্থায় এককভাবে কোনও দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন। ফলে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অনেকেই বলেন, এতে রাজনৈতিক সমঝোতা বাড়ে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এতে সরকার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

গত বছরের গণবিক্ষোভে তীব্র চাপের মুখে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি–এর নেতৃত্বাধীন সরকার। আন্দোলনের জেরে সেপ্টেম্বর মাসে তার পতন ঘটে।

এর তিন দিনের মাথায় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি শুরু করে। মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহার—সব প্রক্রিয়া শেষ করে এখন দেশ ভোটের অপেক্ষায়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রদেশভিত্তিক প্রশাসনিক প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। ফলে নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক কাঠামো প্রস্তুত।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নাম রাজধানী কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বলেন্দ্র শাহ। এক সময়ের গায়ক থেকে রাজনীতিতে আসা এই তরুণ নেতা জেন জ়ি প্রজন্মের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন। আন্দোলনের সময় তিনি সরব ভূমিকা রেখেছিলেন।

তিনি ঝাপা-৫ আসনে সরাসরি লড়ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে। ওলি নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল)–কে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু তরুণ ভোটারদের একাংশ পরিবর্তনের পক্ষে।

আরও এক গুরুত্বপূর্ণ নাম গগন থাপা। তিনি নেপালি কংগ্রেস–এর ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। তুলনামূলকভাবে তরুণ এই নেতা নিজেকে নতুন ধারার রাজনীতির মুখ হিসেবে তুলে ধরছেন।

এ ছাড়া আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহাল, যিনি ‘প্রচণ্ড’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন মাওবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অভিজ্ঞতা ও সংগঠন—দুই দিক থেকেই তিনি শক্ত অবস্থানে।

নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও রাজতন্ত্রপন্থী দলগুলোর প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। রাজেন্দ্র লিংডেন–এর নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি মাঝে মাঝেই রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের ভোটব্যাংক কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের কৌতূহল রয়েছে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হতে পারে তরুণ ভোটাররা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, লাইভ আলোচনা, তরুণ প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি—সব মিলিয়ে রাজনীতির ধরন বদলে গেছে।

অনেক তরুণ ভোটার দুর্নীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিরক্ত। তারা চায় স্বচ্ছ প্রশাসন ও দ্রুত উন্নয়ন। তাই বলেন্দ্র শাহের মতো নতুন মুখদের দিকে ঝুঁকছে একাংশ। তবে অভিজ্ঞ নেতাদেরও পুরোপুরি খারিজ করে দিচ্ছে না সবাই।

ভাবুন তো, আপনার বয়স যদি ২৫ হয়, আপনি চাকরি খুঁজছেন, আর দেখছেন একই পুরোনো মুখ বারবার ক্ষমতায় আসছে—তখন হয়তো আপনিও নতুন কাউকে সুযোগ দিতে চাইবেন। নেপালের তরুণদের মানসিকতাও অনেকটা তেমন।

এই নির্বাচনের ফল শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়। এটি নির্ধারণ করবে নেপালের গণতন্ত্র কতটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। জোট সরকার হলে সমঝোতার রাজনীতি বাড়বে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে, তবে বিরোধী কণ্ঠের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।

সব মিলিয়ে, নেপালের সাধারণ নির্বাচন ২০২৬ শুধু একটি ভোট নয়—এটি পরিবর্তন বনাম অভিজ্ঞতার লড়াই, তরুণ শক্তি বনাম প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার পরীক্ষা।

এখন দেখার বিষয়, ব্যালট বাক্স খুললে কোন পথে হাঁটতে চায় নেপালের জনগণ।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন