Homeবিশেষ প্রতিবেদনভারতকে কী বললেন মির্জা ফখরুল? হাসিনা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

ভারতকে কী বললেন মির্জা ফখরুল? হাসিনা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

Share

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, অন্যদিকে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কূটনৈতিক সমীকরণও বদলাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—একটি মাত্র ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আটকে রাখা উচিত নয়।

ঢাকার গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম The Hindu-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তাঁর ভাষায়, উন্নয়ন প্রকল্প, বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বড় বিষয়গুলোকে এক ব্যক্তিকে ঘিরে থামিয়ে রাখা বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি স্বীকার করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে এবং দেশে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করার জনদাবিও আছে। তাই বাংলাদেশ সরকার চায়, ভারত তাঁকে ফেরত দিক। তবে ভারত যদি তা না-ও করে, তবুও বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া হবে না।

এখানে তাঁর বক্তব্যটা ছিল খুব পরিষ্কার—সম্পর্ক মানে শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতি, ব্যবসা, জনগণের স্বার্থ—সবকিছু মিলেই বড় ছবি তৈরি হয়।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দেশ ছাড়েন। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ভারতের কাছে তাঁদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।

মির্জা ফখরুল বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগগুলো গুরুতর। তাই বিচারিক প্রক্রিয়া চালু থাকবে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ককে তিনি বিচারের সঙ্গে সরাসরি গুলিয়ে ফেলতে চান না।

ভাবুন তো, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক যদি প্রতিটি রাজনৈতিক টানাপোড়েনে থেমে যায়, তাহলে সীমান্ত বাণিজ্য, ভিসা, শিক্ষার্থী বিনিময়—সবই বন্ধ হয়ে যাবে। সেটা তো কারও জন্যই ভালো নয়।

মির্জা ফখরুল অতীতের উদাহরণও টানেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর যখন শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখনও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেন এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই-কে ঢাকায় আতিথ্য দেন। পরে দিল্লি সফরে গিয়ে তিনি ইন্দিরা গান্ধী-র সঙ্গে বৈঠকও করেন।

ফখরুলের মতে, সেটাই ছিল রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণ। ব্যক্তিগত বা দলীয় বিরোধকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পথে বাধা হতে দেওয়া হয়নি। তিনি বোঝাতে চান, এখনো সেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিল ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং গঙ্গার পানি বণ্টন। আগামী বছর গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন সামনে আসবে। ফারাক্কা ব্যারাজ ঘিরে পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।

মির্জা ফখরুল বলেন, এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতেই হবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। আলোচনাই একমাত্র পথ।

আসলে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মানে একটু টানাপোড়েন থাকবেই। কিন্তু টেবিলে বসে কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো বাস্তবসম্মত উপায় নেই।

দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর মতে, প্রতিশোধ আর সহিংসতা দিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা যায় না।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া সীমিত ছিল, ফলে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকে তিনি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। এখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি বলেন, ভারতের কারিগরি শিক্ষায় বিশাল সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার। যদি দুই দেশ যৌথভাবে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নেয়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।

ধরুন, একজন তরুণ আইটি বা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে কাজ পেল। সে শুধু নিজের জীবন বদলাবে না, দেশে রেমিট্যান্সও পাঠাবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে।

নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগের সরকারের নেওয়া ঋণের বোঝা। মির্জা ফখরুল জানান, সব মেগা প্রকল্প নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। কোন প্রকল্প দেশের জন্য সত্যিই প্রয়োজনীয়, আর কোনটি অপচয়—তা যাচাই করা হবে।

তিনি বলেন, যেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে, সেগুলো রাখা হবে। অর্থাৎ উন্নয়ন থামানো নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়াই লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র এজেন্ডা নয়। বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি বণ্টন, দক্ষতা উন্নয়ন—এসবই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘ ইতিহাস ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে। তাই একটি ইস্যুতে ‘বন্দী’ হয়ে থাকলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাস্তববাদী কূটনীতি, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

রাজনীতি বদলাতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বদলায় না। আর সেই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে ভবিষ্যতের পথচলা নির্ধারণ করতে হবে।

@ এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য যশোর খবর কতৃপক্ষ দায়বদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন