বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একেবারেই ভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় রাজনীতির মাঠে তৈরি হয়েছে বড় শূন্যতা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই শূন্যতার সুযোগে বিএনপির জন্য নির্বাচন সহজ হয়ে যাবে।
কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে বাস্তবতা এতটা সরল নয়। বরং বিএনপির সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, আর সেই ফাঁক গলেই শক্ত অবস্থান তৈরি করছে তাদের পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াত—দু’দলেরই শক্তি ও দুর্বলতা এখন প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়। নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের ভেতরের অস্থিরতা, কৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে এক ব্যতিক্রমী বাস্তবতায়। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে একাধিক শক্তি। বিএনপি এই শূন্যতায় নিজেকে স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী ভাবলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোট দ্রুত সংগঠিত হয়ে উঠেছে।
১১টি দল নিয়ে গঠিত এই জোটে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন দলও, যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। একদিকে বড় দল বিএনপি, অন্যদিকে সংগঠিত ও আদর্শভিত্তিক ইসলামী জোট।
বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি এখন তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্ব। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়েছেন। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সামনে পেয়ে অনেকেই আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ ছাড়া বিএনপির সারাদেশে বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এখনও বড় শক্তি। গ্রাম থেকে শহর—দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে বিএনপির পরিচিতি ও ভোটব্যাংক এখনো দৃশ্যমান।
তবে শক্তির পাশাপাশি বিএনপির দুর্বলতাও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রায় ৭৯টি আসনে বহিষ্কৃত বা মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। এতে দলের ভেতর বিভক্তি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও দল হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে, বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতেও বিএনপি পিছিয়ে। এবার ভোটারদের বড় অংশ তরুণ, যারা আগের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। এই তরুণদের ভাবনা, ভাষা ও প্রত্যাশা আলাদা। গতানুগতিক প্রচারে তাদের আকৃষ্ট করা কঠিন, আর এখানেই বিএনপির ঘাটতি স্পষ্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিএনপি জামায়াতের তুলনায় পিছিয়ে। পরিকল্পিত ডিজিটাল প্রচারণায় জামায়াত অনেক বেশি সক্রিয়, যা শহুরে তরুণ ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলছে।
নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও বিএনপি দেরিতে মাঠে নেমেছে। জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে ‘তালিম’-এর মাধ্যমে ঘরে ঘরে নারী কর্মীদের পাঠিয়েছে। বিএনপি উঠান বৈঠক শুরু করলেও সময়ের ঘাটতি এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানের অস্পষ্টতা দলটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
জামায়াতের বড় শক্তি হলো তাদের সংগঠন। মাঠে এবং সামাজিক মাধ্যমে তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় জমায়েত, নিয়মিত প্রচার এবং আদর্শভিত্তিক বার্তা তাদের কর্মীদের চাঙ্গা রেখেছে।
‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির শাসন দেখেছি, এবার নতুন কাউকে দেখতে চাই’—এই বক্তব্য অনেক ভোটারের মধ্যে তারা পৌঁছে দিতে পেরেছে। বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি অংশ এতে আকৃষ্ট হচ্ছে।
তবে জামায়াতেরও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাদের স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন নিয়ে। সংগঠন শক্ত হলেও সারাদেশে বিস্তৃত গণভিত্তি এখনো সীমিত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা আজও বড় বোঝা। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ভুল স্বীকার বা ক্ষমা না চাওয়ায় সমাজের বড় অংশের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়ে গেছে।
নারী অধিকার নিয়েও জামায়াতের অবস্থান অস্পষ্ট। নারীরা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না—এমন বক্তব্য ভোটের মাঠে বিতর্ক তৈরি করেছে। ক্ষমতায় গেলে তারা কতটা উদার নীতি বাস্তবায়ন করবে, সে নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই জামায়াতের। অর্থনীতি, প্রশাসন, পররাষ্ট্রনীতি—এই জটিল ক্ষেত্রগুলো সামলাতে তারা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে ভোটারদের মনে প্রশ্ন আছে।
এবারের নির্বাচনে ভূ-রাজনীতিও বড় ফ্যাক্টর। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিএনপি ও জামায়াত—দু’দলের সঙ্গেই কূটনীতিকদের বৈঠক হচ্ছে।
ভারত প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান অস্পষ্ট বলে অভিযোগ তুলছে ইসলামী দলগুলো। অন্যদিকে, জামায়াতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও স্পষ্ট বার্তা না থাকায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দুই দলের জন্যই বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপি ও জামায়াত—দু’দলই সুযোগ ও সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। বিএনপির রয়েছে বড় দল হিসেবে অভিজ্ঞতা ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও নতুন ভোটারদের সঙ্গে সংযোগের ঘাটতি তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী হলেও ইতিহাস, নারী অধিকার ও শাসনক্ষমতার অভাব তাদের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।
এই বদলে যাওয়া বাস্তবতায় কে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের আস্থা, মাঠের কৌশল এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর।

